🕯️

ভূত চতুর্দশীর লৌকিক প্রথা ও নিয়মাবলী

কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে ১৪ শাক খাওয়া ও ১৪ প্রদীপ দেওয়ার সনাতন নিয়মাবলী।

🕯️ ভূত চতুর্দশী কী এবং কেন পালিত হয়?

কার্তিক অমাবস্যার আগের দিন অর্থাৎ কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিকে **ভূত চতুর্দশী** বলা হয়। বাঙালি সংস্কৃতিতে একে অনেকে ভুতুড়ে রাত হিসেবে মানলেও, এর আসল তাত্পর্য অত্যন্ত গভীর ও আধ্যাত্মিক। বিশ্বাস করা হয়, এই তিথিতে পরলোকগত পূর্বপুরুষরা (চোদ্দো পুরুষ) মর্ত্যে আসেন তাঁদের বংশধরদের দেখতে। তাই এই দিনটি পূর্বপুরুষদের স্মরণে ও গৃহের কল্যাণ কামনায় পালিত হয়।

🔥 ১৪ প্রদীপ (চোদ্দো প্রদীপ) দেওয়ার শাস্ত্রীয় নিয়ম

ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায় ঘরের চৌকাঠ, সিঁড়ি, তুলসী তলা, অন্ধকার কোণ এবং উঠোন মিলিয়ে মোট **১৪টি মাটির প্রদীপ** বা মোমবাতি জ্বালানো হয়।

প্রদীপ জ্বালানোর কারণ:
  • পূর্বপুরুষদের পথ প্রদর্শন: প্রদীপের উজ্জ্বল শিখা চোদ্দো পুরুষের আত্মাকে অন্ধকার থেকে আলোকময় পথের সন্ধান দিয়ে তাঁদের আশীর্বাদ লাভ করতে সাহায্য করে।
  • অশুভ শক্তির বিনাশ: অমাবস্যার ঠিক আগের রাতে অন্ধকারের আধিপত্য কাটাতে এবং অশুভ শক্তি বা নেতিবাচক প্রভাব যাতে ঘরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্যই এই প্রদীপ প্রজ্জ্বলন।

🌿 ১৪ শাক (চোদ্দো শাক) খাওয়ার বৈজ্ঞানিক ও লৌকিক কারণ

ঐতিহ্য অনুসারে ভূত চতুর্দশীর দুপুরে পরিবারের সকলে মিলে একসঙ্গে **১৪ রকম পাতা বা শাক** ভেজে খান। ঋতু পরিবর্তনের সময়ে (শরতের শেষ ও শীতের শুরু) শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এই দেশীয় জংলি লতাপাতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিচে ঐতিহ্যবাহী ১৪ শাকের নামের তালিকা ও তাদের ঔষধি গুণের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো:

শাকের নামঔষধি গুণ ও কার্যকারিতা
১. ওল শাকহজম শক্তি বৃদ্ধি করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
২. কেউ শাকজ্বর প্রশমন করতে ও চর্মরোগ সারাতে বেশ উপকারী।
৩. বেতো শাকভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এবং রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
৪. কলমি শাকরক্তাল্পতা বা আয়রনের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে এবং অনিদ্রা দূর করে।
৫. সর্ষে শাকশরীরকে উষ্ণ রাখে এবং শীতকালীন সর্দি-কাশি থেকে রক্ষা করে।
৬. পালং শাকপ্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ।
৭. পাট শাকমুখের অরুচি দূর করে এবং পেটের বিভিন্ন সমস্যা কমায়।
৮. হিঞ্চে শাকলিভার ভালো রাখতে ও পিত্তনাশক হিসেবে কাজ করে।
৯. বেগুন পাতাঅ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (প্রদাহনাশক) উপাদান সমৃদ্ধ।
১০. নিম পাতাজীবাণুনাশক ও প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে কাজ করে।
১১. শুশনি শাকমস্তিষ্ককে শান্ত রাখে ও রাতের ঘুম ভালো হতে সাহায্য করে।
১২. গিমে শাকরক্তে শর্করার (সুগার) মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
১৩. হেলঞ্চা শাকশরীরকে ডিটক্সিফাই বা বিষমুক্ত করতে অত্যন্ত কার্যকরী।
১৪. নটে শাকআঁশ ও ফাইবার সমৃদ্ধ, হজম প্রক্রিয়া সচল রাখে।
© 2026 আমার পশ্চিমবঙ্গ সেবা পোর্টাল • ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধার সাথে লালন করতে সচেষ্ট।