কোজাগরী লক্ষ্মী ব্রতকথা (লৌকিক উপাখ্যান)
একদা অবন্তী নগরে ধনেশ্বর নামে এক অতি সচ্ছল বণিক বাস করিতেন। তিনি ছিলেন পরোপকারী, অতিথিবৎসল এবং ধর্মপরায়ণ। কিন্তু বিধির লিখনে এবং গ্রহের ফেরে তাঁর সমস্ত ধন-সম্পত্তি এক নিমেষে বিলীন হইয়া গেল। ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম ক্ষতি হইল এবং পাওনাদারদের অত্যাচারে তিনি গৃহত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। বণিকের সাধ্বী স্ত্রী ও গুণবতী কন্যারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাইতে লাগিলেন।
বণিক হতাশ হৃদয়ে বনের মধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে এক মহর্ষির দেখা পাইলেন। মহর্ষির চরণে প্রণাম করিয়া বণিক নিজের দুঃখের কাহিনী সবিস্তারে নিবেদন করিলেন। ঋষি ধ্যানে বসিলেন এবং মৃদু হাসিয়া কহিলেন, "হে বণিক! তোমার এই দুঃখের কারণ অলক্ষ্মীর কোপ। গৃহ যখন অপরিচ্ছন্ন থাকে, কলহ ও অসন্তোষ বিরাজ করে, তখন দারিদ্র্যের দেবী অলক্ষ্মী সেখানে আসন পাতেন। অলক্ষ্মীকে বিদায় করিয়া সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীকে ফিরাইতে হইলে তোমাকে ও তোমার পরিবারকে কোজাগরী পূর্ণিমার ব্রত পালন করিতে হইবে।"
ঋষি পূজার বিধান দিলেন: "আশ্বিন পূর্ণিমার দিন উপবাস রাখিয়া সন্ধ্যায় ঘরের উঠোনে অলক্ষ্মী বিদায় করিবে। ভাঙা কুলো পিটিয়ে অলক্ষ্মীকে তাড়িয়ে হাত-পা ধুয়ে পবিত্র হইবে। এরপর চালের পিঠুলি দিয়ে ঘরে লক্ষ্মী দেবীর শ্রীচরণ চিহ্ন (আলপনা) অঙ্কন করিবে। মা লক্ষ্মীর আগমন কামনায় সারা ঘরে প্রদীপ জ্বালিবে এবং কোজাগরী রাতে জাগ্রত থাকিবে। মধ্যরাতে পূর্ণিমার আলোয় যখন মা লক্ষ্মী মর্ত্যে নেমে আসবেন, তখন তিনি জিজ্ঞেস করবেন—কে জাগর্তি? (অর্থাৎ, কে জেগে আছ?)। যে ব্যক্তি এই রাতে জাগ্রত থেকে ভক্তিভরে মায়ের পূজা ও স্তোত্র পাঠ করবে, দেবী তাকে অক্ষয় ধন-ধান্য অর্পণ করবেন।"
বণিক ঋষির আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করিলেন। আশ্বিন পূর্ণিমার রাতে তাঁর পরিবার উপবাস রাখিয়া আলপনা দিলেন, উঠোনে অলক্ষ্মী বিদায়ের আচার সম্পন্ন করিলেন এবং সারা রাত জেগে মা লক্ষ্মীর পাঁচালী পাঠ করিলেন। মধ্যরাতে ভক্তিভরে ডাকার পর, মা লক্ষ্মী তাদের কুটিরে পদার্পণ করিলেন এবং তাদের পূর্বের চেয়েও দ্বিগুণ সম্পদ ও সুখের আশীর্বাদ দিলেন। সেই হইতে আজ পর্যন্ত বাংলার ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা সাড়ম্বরে উদযাপিত হইয়া আসিতেছে।
শ্রী শ্রী লক্ষ্মী দেবীর পাঁচালী (সম্পূর্ণ পাঠ্য)
॥ বন্দনা ॥
নমো নমো মহালক্ষ্মী নমো নারায়ণ-প্রিয়া।
মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হও জগৎ জুড়িয়া॥
শ্বেতপদ্ম সিংহাসনে দেবী সুরেশ্বরী।
দয়া করি পদধূলি দাও মা সুন্দরী॥
॥ আশ্বিন পূর্ণিমার মাহাত্ম্য ॥
দুর্গাপূজা অবসান দিন কত পরে।
আশ্বিন পূর্ণিমা এল জগতের ঘরে॥
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা নামে যার খ্যাতি।
ধন্য ধন্য কলিযুগে নরনারী জাতি॥
পূর্ণিমার শশী হাসে নীল নভোতলে।
মা লক্ষ্মীর পূজা হবে প্রতি ঘরে ঘরে॥
॥ লক্ষ্মীর নীতি নির্দেশিকা ॥
যে জন করয়ে সদা আলপনা দান।
সন্ধ্যাবেলা ঘরে ঘরে জ্বালে দীপবান॥
অতিথিরে অম্লমুখে কভু নাহি তাড়ায়।
পিতা-মাতা গুরুজনে ভক্তি নিয়ে পূজায়॥
তার ঘরে আমি থাকি আনন্দিত মনে।
সম্পদ বিলাই আমি তাহার ভবনে॥
অপরিষ্কার শুষ্ক ঘরে কভু আমি নাই।
হিংসা আর কলহ দেখি দূরে চলে যাই॥
॥ কোজাগরী ব্রতের ফল ॥
কোজাগরী পূর্ণিমায় যে জন জাগে রাতে।
ব্রতকথা পাঠ করে ভক্তিভরা চিতে॥
দারিদ্র্য ঘুচিয়া যায় মা লক্ষ্মীর বরে।
অক্ষয় সম্পদ রহে তাহার মন্দিরে॥
ইতি শ্রী শ্রী লক্ষ্মী দেবীর পাঁচালী সমাপ্ত॥