ঐতিহ্য · উত্তর ২৪ পরগনা

চন্দ্রকেতুগড়: ধানখেতের নীচে হারানো নগর

কলকাতা থেকে মোটে চল্লিশ-পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে, লাঙল চালাতে গিয়ে চাষিরা বারবার পেতেন ছোট ছোট মাটির মূর্তি। তাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন দু-হাজার বছরের পুরনো এক নগরের উপর।

৩ মিনিটে পড়া · হালনাগাদ

কাদায় চাষির লাঙল কিছুতে আটকে গেল। তুলে মুছে দেখলেন: হাতের তালুর চেয়ে বড় নয় এমন এক মাটির নারী, কানে ভারী দুল, মাথায় উঁচু খোঁপা, মুখে হাসি।

প্রায় দু-হাজার বছর ধরে তিনি ওই খেতেই ছিলেন।

চন্দ্রকেতুগড় হল উত্তর ২৪ পরগনার বেড়াচাঁপা-কে ঘিরে কয়েকটি গ্রাম, কলকাতা থেকে সরলরেখায় প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। তাদের নীচে এমন এক নগরের ধ্বংসাবশেষ, যেখানে অন্তত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে পাল-সেন যুগ পর্যন্ত, অর্থাৎ হাজার বছরেরও বেশি, মানুষের বাস ছিল। নিজের সুদিনে এটি ছিল নদীবন্দর — গঙ্গার বদ্বীপ বেয়ে সাগর পর্যন্ত বাণিজ্য।

মাটি যা ফিরিয়ে দিল

১৯৫৭ থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালা এখানে খনন চালায়। তারা, আর তার আগে-পরে চাষিরা, খুঁজে পেয়েছেন:

  • টেরাকোটা ফলক, আশ্চর্য সূক্ষ্ম: দেবী ও যক্ষী, যুগল, নর্তকী, পশু, রোজকার জীবনের দৃশ্য। ভারতের প্রাচীন টেরাকোটার মধ্যে এগুলি অন্যতম শ্রেষ্ঠ।
  • সিলমোহর ও লিপি, ব্রাহ্মী অক্ষরে, কয়েকটিতে জাহাজের ছবি, আর একটিতে, এক পাঠ অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার প্রাচীন নাম তাম্রপর্ণীর উল্লেখ।
  • মুদ্রা, যার মধ্যে রুপোর ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, আর গুপ্ত রাজা প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও রানি কুমারদেবীর সোনার মুদ্রা।
  • সূক্ষ্ম মৃৎপাত্র ও পুঁতি, যার মধ্যে মৌর্য যুগের বিলাসী বাসন — উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্র।

এটাই কি গঙ্গারিডাই?

গ্রিক ও রোমান লেখকেরা গঙ্গার মোহনায় এক শক্তিশালী জাতির কথা লিখেছেন — গঙ্গারিডাই — যুদ্ধহাতিতে এত বলবান যে, গল্প বলে, আলেকজান্ডারের বাহিনী তাদের মুখোমুখি হতে চায়নি। তারা ঠিক কোথায় থাকত, আজও মীমাংসা হয়নি। সঠিক সময়ের, সঠিক জায়গার এক সমৃদ্ধ বন্দর হিসেবে চন্দ্রকেতুগড় সবচেয়ে জোরালো দাবিদারদের একটি। এটা অনুমান, প্রমাণিত সত্য নয়, আর বদ্বীপের অন্য কয়েকটি জায়গারও সমর্থক আছেন।

ছড়িয়ে যাওয়া নগর

চন্দ্রকেতুগড়ের দুঃখের অধ্যায় এর পরেরটুকু। চাষিরা দশকের পর দশক নিজেদের জমিতে টেরাকোটা পেয়েছেন বলে অনেক নিদর্শন বিক্রি হয়ে গেছে, আজ তা ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশের ব্যক্তিগত সংগ্রহ আর জাদুঘরে। জায়গাটির বড় অংশ আজও বৈজ্ঞানিকভাবে খোঁড়া হয়নি, আর নিদর্শনগুলির কালানুক্রম এখনও পুরো স্থির হয়নি।

সত্যি না গল্প?

উত্তর দেখতে দাবিটির উপর ট্যাপ করুন।

“চন্দ্রকেতুগড় নিশ্চিতভাবেই গ্রিকদের গঙ্গারিডাই।”
আংশিক সত্যি

এটি সবচেয়ে জোরালো দাবিদারদের একটি, কিন্তু প্রমাণিত নয়, আর বদ্বীপের অন্য কয়েকটি জায়গার কথাও বলা হয়।

“চন্দ্রকেতু নামে এক রাজার নামে চন্দ্রকেতুগড়।”
লোকবিশ্বাস

নামটি এসেছে মধ্যযুগের রাজা চন্দ্রকেতুর এক স্থানীয় কিংবদন্তি থেকে, প্রাচীন নগরের কোনো নথি থেকে নয়।

ছোট্ট কুইজ

  1. ১. ১৯৫৭–৬৮-তে চন্দ্রকেতুগড়ে কারা খনন করে?

  2. ২. চন্দ্রকেতুগড় সবচেয়ে বিখ্যাত কীসের জন্য?

  3. ৩. চন্দ্রকেতুগড় কোন জেলায়?

কাউকে পাঠান

কলকাতা থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে লাঙল চালাতে গিয়ে চাষিরা বারবার পেতেন মাটির মূর্তি — তাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন দু-হাজার বছরের পুরনো এক বন্দরনগর, চন্দ্রকেতুগড়ের উপর। 🏺

তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন
  • Chandraketugarh (Wikipedia) — অবস্থান, কালপর্ব, ১৯৫৭–৬৮-র খনন, নিদর্শন
  • Gautam Sengupta, Sharmi Chakraborty (eds), Archaeology of Early Historic South Asia (Pragati, 2008)
  • আশুতোষ সংগ্রহশালা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় — খননের নথি ও সংগ্রহ

লেখা ও পুনর্কথন: আমার পশ্চিমবঙ্গ। লোককথাগুলি আমাদের নিজের ভাষায় নতুন করে বলা; ঐতিহাসিক তথ্য নীচের সূত্র অনুযায়ী। কোনো ভুল চোখে পড়লে আমাদের লিখুন, শুধরে দেব।