বাংলা, অষ্টম শতকের গোড়া। প্রায় একশো বছর ধরে এমন কোনো রাজা নেই যাঁকে সবাই মানে। প্রত্যেক সর্দার লড়ছে প্রত্যেকের সঙ্গে; সবল গিলে খাচ্ছে দুর্বলকে।
মানুষ এর একটা নাম দিয়েছে: মাৎস্যন্যায় — মাছের নিয়ম, যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে খায়।
আর তখন বাংলার সর্দারেরা এক অসাধারণ কাজ করলেন। সবাই মিলে একজনকে বেছে নিয়ে তাঁকে রাজা করলেন।
তিনি গোপাল, আর আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রতিষ্ঠিত পাল বংশ বাংলা শাসন করবে চারশো বছর। সাম্রাজ্যের চূড়ায় পাল রাজ্য গাঙ্গেয় সমভূমি পেরিয়ে পৌঁছেছিল কনৌজে, তার মহাবিহারে পড়তে আসত তিব্বত থেকে সুমাত্রার ছাত্র, আর তার কবিরা লিখে গেছেন টিকে থাকা প্রাচীনতম বাংলা।
পালদের আগে: গৌড়ের শশাঙ্ক
বাংলার প্রথম বড় রাজা শশাঙ্ক, যিনি সপ্তম শতকের গোড়ায় আজকের মুর্শিদাবাদের কাছে কর্ণসুবর্ণ থেকে গৌড় শাসন করতেন। কনৌজের প্রবল প্রতাপ হর্ষবর্ধনের সমকক্ষ ছিলেন তিনি — আর হর্ষের পক্ষের বৌদ্ধ লেখকেরা, পরিব্রাজক হিউয়েন সাং সহ, তাঁকে খলনায়ক করে এঁকেছেন। ঐতিহাসিকেরা সেসব বিবরণ সাবধানে পড়েন।
অনেক ঐতিহাসিক শশাঙ্ককে যুক্ত করেন বাংলা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে: বঙ্গাব্দের সূচনা ৫৯৩–৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে, যাকে কেউ কেউ তাঁর রাজত্বের শুরু বলে মনে করেন। অন্যরা পঞ্জিকা সংস্কারের কৃতিত্ব দেন মুঘল সম্রাট আকবরকে। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলা ডুবে যায় সেই অরাজকতায়, যার অবসান ঘটাবেন পালেরা।
গোপাল: নির্বাচিত রাজা
খালিমপুরে পাওয়া গোপালের ছেলের একটি তাম্রশাসন বলছে, মাৎস্যন্যায় দূর করতে ‘প্রকৃতি’, অর্থাৎ প্রজারা, গোপালকে রাজা করেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে খুব সম্ভবত সর্দারেরাই তাঁকে বেছেছিলেন, গোটা জনগণ নয়। তবু অষ্টম শতকে জয় করে নয়, সম্মতিতে সিংহাসন পাওয়া রাজা ছিলেন বিরল — আর বাংলা তা নিয়ে গর্বিত।
ধর্মপাল ও দেবপাল: উত্তর ভারত জুড়ে সাম্রাজ্য
আনুমানিক ৭৫০–৭৭০
গোপাল বংশ প্রতিষ্ঠা করেন, বাংলায় শৃঙ্খলা ফেরান।
আনুমানিক ৭৭০–৮১০
ধর্মপাল উত্তর ভারতের সেরা পুরস্কার কনৌজের জন্য প্রতিহার আর রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে লড়েন, নিজের মনোনীত রাজাকে সেখানকার সিংহাসনে বসান। তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন, আর পাহাড়পুরের বিশাল সোমপুর মহাবিহারের কৃতিত্বও তাঁর।
আনুমানিক ৮১০–৮৫০
দেবপাল সাম্রাজ্যকে চূড়ায় নিয়ে যান। সুমাত্রা ও জাভার রাজা বালপুত্রদেব নালন্দায় একটি বিহারের জন্য জমি চাইলে তিনি দান করেন।
আনুমানিক ৯৮৮–১০৩৬
প্রথম মহীপাল হারানো এলাকা ফিরিয়ে বংশকে নতুন প্রাণ দেন।
একাদশ শতকের শেষ
কৈবর্ত নেতা দিব্য-র নেতৃত্বে বিদ্রোহে এক পাল রাজা নিহত হন, উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র বিদ্রোহীদের হাতে যায়। রামপাল তা পুনরুদ্ধার করেন; সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’ সেই কাহিনি।
দ্বাদশ শতক
পালেরা ম্লান হয়ে আসেন, বাংলা যায় সেনদের হাতে।
অতীশ, হিমালয় পেরোনো বাঙালি
পাল যুগের বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, দশম শতকের শেষে ঢাকার কাছে বিক্রমপুরে জন্ম। বিক্রমশীলার আচার্য, ষাটের কোঠায় তিব্বতের শাসকদের আমন্ত্রণে তিনি তিব্বতে যান, বাকি জীবন সেখানেই কাটান, আর তিব্বতি বৌদ্ধধর্মকে নতুন রূপ দেন। তিব্বতে আজও তিনি পূজিত।
প্রথম বাংলা: চর্যাপদ
১৯০৭ সালে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কাঠমান্ডুর রাজদরবারের গ্রন্থাগারে খুঁজে পান তালপাতার এক পুঁথি — পাল যুগের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের গান। এই গানগুলি, চর্যাপদ, লেখা বাংলার এখনও পর্যন্ত পাওয়া প্রাচীনতম রূপে। রবীন্দ্রনাথ থেকে আজকের খবরের কাগজ — প্রতিটি বাংলা লেখার পূর্বপুরুষ এরাই।
পাল যুগের বাংলা জন্ম দিয়েছিল নিজস্ব এক ভাস্কর্যধারারও: মসৃণ কালো পাথরে খোদাই আর ব্রোঞ্জে ঢালাই মূর্তি, যার লাবণ্য প্রভাব ফেলেছে নেপাল থেকে জাভা পর্যন্ত। কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে আছে তার কিছু সেরা নিদর্শন।
সেন রাজারা: জয়দেবের রাজসভা
সেনেরা নিজেদের বিবরণ অনুযায়ী দক্ষিণের কর্ণাট থেকে আসেন, পালদের অধীনে কাজ করে পরে তাঁদের জায়গা নেন। বিজয়সেন দ্বাদশ শতকে ষাট বছরেরও বেশি রাজত্ব করেন; তাঁর ছেলে বল্লালসেন গৌড় দখল করেন, আর প্রথা অনুযায়ী কৌলীন্য প্রথার সংগঠক হিসেবে স্মরণীয়। শেষ বড় সেন রাজা লক্ষ্মণসেন (আনুমানিক ১১৭৯–১২০৬)-এর সভায় ছিলেন কবিরা, তাঁদের মধ্যে জয়দেব, যাঁর রাধাকৃষ্ণের প্রেমগীতি ‘গীতগোবিন্দ’ আজও গোটা ভারতে গাওয়া হয়।
আঠারো অশ্বারোহী
আনুমানিক ১২০৩–০৪ সালে ঘুরি সুলতানদের এক তুর্কি সেনাপতি, বখতিয়ার খলজি, ঢুকে পড়েন নদিয়ায়, যেখানে তখন বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণসেন ছিলেন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের বিবরণ অনুযায়ী তিনি এসেছিলেন মাত্র আঠারোজন অশ্বারোহী নিয়ে — এত কম যে লোকে তাঁদের ঘোড়ার ব্যাপারী ভেবেছিল — আর কেউ সাবধান হওয়ার আগেই পৌঁছে যান প্রাসাদের দরজায়। আহাররত রাজা খিড়কি দরজা দিয়ে বেরিয়ে পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যান।
মূল বাহিনী এসে পৌঁছয় কিছু পরেই, আর বাংলা চলে যায় দিল্লি সালতানাতের হাতে। পূর্ববঙ্গে সেনেরা আরও কয়েক দশক টিকে ছিলেন, কিন্তু গোপালের সঙ্গে যে যুগের শুরু, তার অবসান হল।
এই যুগকে আজ কোথায় দেখবেন
- ভারতীয় জাদুঘর, কলকাতা — পাল যুগের পাথর ও ব্রোঞ্জের মূর্তি।
- জগজ্জীবনপুর, মালদা — যেখানে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা খুঁড়ে পেয়েছেন এক পাল বিহার, নন্দদীর্ঘিকা মহাবিহার, আর পাল রাজা মহেন্দ্রপালের একটি তাম্রশাসন।
- কর্ণসুবর্ণ (রাজবাড়িডাঙা), মুর্শিদাবাদ — শশাঙ্কের রাজধানী আর রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের স্থান।
- গৌড়, মালদা — সেন ও পরে সুলতানি আমলের রাজধানী। সেখানে যা ধ্বংসাবশেষ দেখেন, যেমন বড় সোনা মসজিদ, তার বেশিরভাগই পরের সুলতানি যুগের।
- বড় পাল মহাবিহারগুলি অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের বাইরে: বিক্রমশীলা ও নালন্দা বিহারে, সোমপুর (পাহাড়পুর) বাংলাদেশে।