রাস্তা চলেছে সমতল সবুজ ধানখেত আর সুপুরিগাছের মাঝ দিয়ে, টিনের চালের বাড়ি আর চায়ের দোকান পেরিয়ে। তারপর গাছের ফাঁক খুলে যায়, আর সামনে সেটা: খিলান-অলিন্দের সারি আর মাঝখানে উঁচু গম্বুজওয়ালা লম্বা এক প্রাসাদ, যেন ফ্লোরেন্সের কোনো ভিলা ভুল পথে চলে এসেছে।
কোচবিহার রাজবাড়ি তৈরি হয় ১৮৮৭ সালে, মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের জন্য, ইতালীয় রেনেসাঁ ধাঁচে। এর আয়তন একান্ন হাজার বর্গফুটেরও বেশি, আর গম্বুজ মাটি থেকে প্রায় ১২৪ ফুট উঁচু। আজ এটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI)-এর জাদুঘর।
কোচ রাজারা
কোচ রাজবংশের উত্থান ষোড়শ শতকের গোড়ায়, আর নরনারায়ণের আমলে, ভাই চিলারায়ের সেনাপতিত্বে, তা হয়ে ওঠে উত্তর-পূর্বের অন্যতম বড় শক্তি। ১৫৮০-র দশকে নরনারায়ণের মৃত্যুর পর রাজ্য ভাগ হয়, আর পশ্চিমের অংশ হয় কোচবিহার রাজ্য। ১৭৭০-এর দশকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে তা দেশীয় রাজ্য হিসেবে টিকে থাকে, নিজের মহারাজাদের শাসনে — একেবারে স্বাধীনতা পর্যন্ত।
যে মহারাজার বিয়ে ব্রাহ্মসমাজ ভাঙল
নৃপেন্দ্রনারায়ণ (রাজত্বকাল ১৮৬৩–১৯১১) রাজবাড়ি আর তাকে ঘিরে শহরটিকে আধুনিক রাজধানী হিসেবে গড়েন। তাঁর বিয়েও ইতিহাস হয়ে আছে। ১৮৭৮-এর ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিয়ে করেন সংস্কারপন্থী ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনের মেয়ে সুনীতি দেবীকে। ব্রাহ্মরা বিয়ের ন্যূনতম বয়সের জন্য আন্দোলন করেছিলেন, আর বর-কনে দুজনেই ছিলেন সেই বয়সের নীচে। কেশবের অনুগামীরা ক্ষুব্ধ হন, আর সে বছরই বিরোধীরা বেরিয়ে এসে গড়েন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ।
রাজবাড়ি
প্রাসাদটি লম্বা, দোতলা, ইটের তৈরি, দুই তলা জুড়েই খিলানের সারি, আর মাঝখানে গম্বুজের নীচে উঁচু দরবার কক্ষ। একসময় এর কিছু অংশ তিনতলা ছিল, কিন্তু ১৮৯৭-এর আসামের প্রবল ভূমিকম্পে উপরের তলা ভেঙে পড়ে। ভিতরের জাদুঘরে রাজপরিবারের ছবি, আসবাব, পোশাক আর কোচ রাজদরবারের নানা জিনিস।
এক রাজ্যের অবসান
স্বাধীনতার পর শেষ মহারাজা ১৯৪৯ সালে কোচবিহারকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করতে রাজি হন, আর ১৯৫০-এ এটি পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা হয়। রাজবাড়ি চলে আসে রাজ্যের হাতে, আর সেখান থেকে ASI-এর।