ঐতিহ্য · মুর্শিদাবাদ

হাজারদুয়ারী: হাজার দরজার প্রাসাদ

এমন এক নবাবের জন্য তৈরি, যাঁর বংশ ততদিনে বাংলা হারিয়েছে — আর যার কিছু দরজা খুললে দেওয়াল। আর তাকে ঘিরে সেই শহর, যাকে একদিন লন্ডনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।

৩ মিনিটে পড়া · হালনাগাদ

বিশাল সাদা স্তম্ভের মাঝখান দিয়ে সাঁইত্রিশটা পাথরের সিঁড়ি ভেঙে ওঠেন, আর ভিতরে চারদিকে দরজা: প্রতিটি অলিন্দ ধরে, প্রতিটি হলঘরের শেষে।

ভুল দরজা খুললে পিছনে শুধু দেওয়াল।

গাইডরা বলবেন, সেটাই নাকি উদ্দেশ্য। তাড়াহুড়োয় থাকা অনুপ্রবেশকারী কখনও বেরোনোর পথ খুঁজে পাবে না।

হাজারদুয়ারী — ‘হাজার দরজার প্রাসাদ’ — দাঁড়িয়ে আছে ভাগীরথীর তীরে, মুর্শিদাবাদে, একসময়ের বাংলার নবাবদের রাজধানীতে। আসল আর নকল মিলিয়ে দরজা প্রায় হাজারটি; তার কতগুলি নকল, তা নিয়ে সূত্রে মতভেদ আছে, যদিও সবচেয়ে বেশি শোনা যায় একশোর কথা।

নবাবদের শহর

মুর্শিদাবাদের নাম মুর্শিদকুলি খাঁর নামে — যে মুঘল কর্মকর্তা আঠারো শতকের গোড়ায় বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে এখানে সরিয়ে আনেন। পঞ্চাশ বছর ধরে এটি ছিল এশিয়ার অন্যতম ধনী শহর। ১৭৫৭-তে পলাশীর পরে এসে রবার্ট ক্লাইভ লিখেছিলেন, এ শহর লন্ডনের মতোই বিস্তৃত, জনবহুল আর সমৃদ্ধ।

পলাশী সব শেষ করে দিল। নবাবেরা থেকে গেলেন, উপাধি আর প্রাসাদ নিয়ে, কিন্তু ক্ষমতা আর রাজস্ব চলে গেল কলকাতার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে।

প্রাসাদ

হাজারদুয়ারী তৈরি হয় নবাব হুমায়ুন জাহের জন্য, ১৮২৯ থেকে ১৮৩৭ সালের মধ্যে — পলাশীর অনেক পরে — বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্সের স্কটিশ অফিসার ডানকান ম্যাকলিওডের নকশায়। বাংলার মাটিতে এক ইউরোপীয় প্রাসাদ: ইতালীয় ও নিওক্লাসিক্যাল ধাঁচ, তিনতলা, ১১৪টি ঘর, ডোরিক স্তম্ভে ধরা প্রবেশ-অলিন্দ। তাক লাগানোর জন্যই তৈরি — আজও লাগায়।

১৯৮৫ সাল থেকে এটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI)-এর জাদুঘর। ভিতরে নবাবদের ছবি, আসবাব, অস্ত্রশস্ত্র, বিরাট ঝাড়বাতি, আর আরবি, ফারসি ও উর্দুতে হাজার হাজার পুঁথির গ্রন্থাগার।

মুর্শিদাবাদে আর কী দেখবেন

  • নিজামত ইমামবাড়া — হাজারদুয়ারীর মুখোমুখি, ভারতের বৃহত্তম ইমামবাড়াগুলির একটি, আগেরটি পুড়ে যাওয়ার পর তৈরি।
  • ঘড়িঘর আর মদিনা মসজিদ — একই প্রাঙ্গণে।
  • বাচ্চাওয়ালি তোপ — প্রাঙ্গণের পুরনো কামান, যার নামের ব্যাখ্যায় স্থানীয় কিংবদন্তি বলে তার গর্জনের প্রভাবের এক গল্প।
  • কাটরা মসজিদ — মুর্শিদকুলি খাঁর তৈরি বিশাল মসজিদ, যার প্রবেশপথের সিঁড়ির নীচে তিনি নিজের সমাধি চেয়েছিলেন, যাতে নামাজিরা তাঁর উপর দিয়ে হেঁটে যান।
  • জাহানকোষা — ‘জগৎজয়ী’, সপ্তদশ শতকে ঢালাই করা বিশাল এক কামান।
  • কাঠগোলা বাগান আর তার প্রাসাদ, এক জৈন বণিক পরিবারের তৈরি।
  • খোশবাগ, নদীর ওপারে, যেখানে আলিবর্দি খান আর সিরাজউদ্দৌলার সমাধি। যাওয়ার আগে পড়ে নিন পলাশীর কাহিনি।
  • নিমকহারাম দেউড়ি — মীর জাফরের প্রাসাদের তোরণকে শহর এই নামেই ডাকে।

সত্যি না গল্প?

উত্তর দেখতে দাবিটির উপর ট্যাপ করুন।

“হাজারদুয়ারী সিরাজউদ্দৌলার তৈরি।”
ভুল ধারণা

এটি তৈরি ১৮২৯ থেকে ১৮৩৭-এর মধ্যে — সিরাজের মৃত্যুর সত্তর বছর পরে — নবাব হুমায়ুন জাহের জন্য।

“হাজারদুয়ারীর ঠিক একশোটি দরজা নকল।”
আংশিক সত্যি

এটাই সবচেয়ে প্রচলিত সংখ্যা, কিন্তু সূত্রে মতভেদ আছে, আর ASI শুধু বলে আসল-নকল মিলিয়ে প্রায় হাজার দরজা।

ছোট্ট কুইজ

  1. ১. হাজারদুয়ারীর নকশা কার?

  2. ২. মুর্শিদাবাদের নাম কার নামে?

  3. ৩. সিরাজউদ্দৌলার সমাধি কোথায়?

কাউকে পাঠান

হাজারদুয়ারীতে প্রায় হাজারটা দরজা — আর তার কিছু খুললে সামনে নিরেট দেওয়াল, অনুপ্রবেশকারীকে ধাঁধায় ফেলতে। 🚪

তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন

লেখা ও পুনর্কথন: আমার পশ্চিমবঙ্গ। লোককথাগুলি আমাদের নিজের ভাষায় নতুন করে বলা; ঐতিহাসিক তথ্য নীচের সূত্র অনুযায়ী। কোনো ভুল চোখে পড়লে আমাদের লিখুন, শুধরে দেব।