ঐতিহ্য · মালদা

গৌড়: যে রাজধানীকে নদী ছেড়ে গেল

একসময় পৃথিবীর অন্যতম বড় নগর, আজ বাংলাদেশ সীমান্তে আমবাগানের মাঝে ধ্বংসস্তূপ। আর সেই গ্রাম, যেখানে চৈতন্য দুই মন্ত্রীর জীবন বদলে দিয়েছিলেন।

৩ মিনিটে পড়া · হালনাগাদ

যতদূর চোখ যায়, শুধু আমবাগান। তারপর তার মাঝ থেকে মাথা তোলে এক তোরণ — ছোট ছোট লাল ইটে গাঁথা, ষাট ফুট উঁচু, হাতি গলে যাওয়ার মতো চওড়া। পিছনে কোনো নগর নেই। সাড়ে চারশো বছর ধরে নেই।

মালদা জেলার গৌড়, বাংলাদেশ সীমান্তে, মুঘলদের আগের চার শতকের বেশিরভাগ সময় ছিল বাংলার রাজধানী। নাম ছিল অনেক: সেন রাজাদের আমলে লক্ষ্মণাবতী, সুলতানদের আমলে লখনৌতি, মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের আমলে জন্নতাবাদ — ‘স্বর্গপুরী’। ষোড়শ শতকের গোড়ায়, কোনো কোনো হিসেবে, এটি ছিল পৃথিবীর জনবহুলতম নগরগুলির একটি।

চার শতকের রাজধানী

  1. দ্বাদশ শতক

    সেন রাজারা গৌড় দখলে রাখেন, আর লক্ষ্মণসেনের নামে নগরের নাম হয় লক্ষ্মণাবতী।

  2. ১২০৪ থেকে

    বখতিয়ার খলজির বিজয়ের পর লখনৌতি হয় বাংলায় দিল্লি সালতানাতের শাসনকর্তাদের কেন্দ্র — যাঁরা একাধিকবার দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।

  3. ১৩৪২

    ইলিয়াস শাহ বাংলাকে এক স্বাধীন সালতানাতে একত্র করেন, প্রথমে কাছের পাণ্ডুয়া থেকে শাসন।

  4. ১৪৫০-এর দশক–১৫৬৫

    রাজধানী ফেরে গৌড়ে। হুসেন শাহি সুলতানদের আমলে তা পৌঁছয় চূড়ায়: মসজিদ, তোরণ, মিনার, খাল আর প্রাসাদ।

  5. ১৫৬৫–১৫৭৬

    রাজধানী সরে যায় টান্ডায়। মুঘলেরা গৌড় দখল করে, মহামারি ছড়ায়, আর সরে যাওয়া গঙ্গা নগরটিকে শুকনো ডাঙায় ফেলে যায়। গৌড় পরিত্যক্ত হয়।

কী দেখবেন

  • বড় সোনা মসজিদ — ১৫২৬-এ সম্পূর্ণ, গৌড়ের বৃহত্তম স্মারক; একসময় গম্বুজে সোনার গিলটি ছিল বলে এই নাম।
  • দাখিল দরওয়াজা — পঞ্চদশ শতকের লাল ইটের বিশাল আনুষ্ঠানিক তোরণ, যা দিয়ে সুলতানেরা দুর্গে প্রবেশ করতেন।
  • ফিরোজ মিনার — পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকের সরু, পাঁচতলা বিজয়স্তম্ভ।
  • কদম রসুল — ১৫৩০-এর মসজিদ, যেখানে রাখা এক পাথরে নাকি নবির পদচিহ্ন।
  • লোটন মসজিদ — যার গায়ে আজও রয়ে গেছে নীল, সবুজ, হলুদ চকচকে টালির কিছুটা, যা একসময় গৌড়কে ঝলমলে করে রাখত।
  • কোতোয়ালি দরওয়াজা — নগরের পুরনো দক্ষিণ তোরণ, যা আজ দাঁড়িয়ে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে।

পাণ্ডুয়া আর আদিনা মসজিদ

মালদা শহরের উত্তরে, গৌড়ের উল্টো দিকে, পাণ্ডুয়া, স্বাধীন সুলতানদের প্রথম রাজধানী। সুলতান সিকান্দার শাহের ১৩৭০-এর দশকে তৈরি আদিনা মসজিদ ছিল উপমহাদেশে নির্মিত বৃহত্তম মসজিদগুলির একটি — বিশাল এক প্রাঙ্গণ ঘিরে খিলানের অরণ্য। ছাদের বড় অংশ ভেঙে পড়েছে, তাতে সৌন্দর্য বেড়েছে বই কমেনি।

রামকেলি: চৈতন্য আর দুই মন্ত্রী

গৌড়ের কাছেই রামকেলি গ্রাম। কথিত আছে, ষোড়শ শতকের গোড়ায় চৈতন্য মহাপ্রভু বৃন্দাবনের পথে এখানে থামেন, আর দেখা হয় সুলতান হুসেন শাহের দুই উচ্চপদস্থ কর্মচারী ভাইয়ের সঙ্গে। পরে তাঁরা পদ ছেড়ে তাঁর অনুগামী হন, আর হয়ে ওঠেন রূপ ও সনাতন গোস্বামী — গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের দুই শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক। তাঁদের স্মরণে রামকেলিতে আজও প্রতি বছর মেলা বসে।

সত্যি না গল্প?

উত্তর দেখতে দাবিটির উপর ট্যাপ করুন।

“বড় সোনা মসজিদ সোনায় মোড়া ছিল।”
আংশিক সত্যি

নামটা নাকি এসেছে একসময় গম্বুজ ঢেকে রাখা সোনার গিলটি থেকে। সোনা যদি থেকেও থাকে, তা বহুকাল আগেই নেই।

“যুদ্ধে গৌড় ধ্বংস হয়েছিল।”
ভুল ধারণা

গৌড় নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা পরিত্যক্ত হয় গঙ্গা সরে যাওয়ায় আর মহামারিতে, রাজধানী সরে যাওয়ার পরে।

ছোট্ট কুইজ

  1. ১. দিল্লি সালতানাতের আমলে গৌড়ের নাম কী ছিল?

  2. ২. রামকেলিতে রূপ-সনাতনের সঙ্গে কোন সাধকের দেখা হয়?

  3. ৩. পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ কে তৈরি করেন?

কাউকে পাঠান

মালদার গৌড় একসময় ছিল পৃথিবীর অন্যতম বড় নগর। তারপর গঙ্গা গতিপথ বদলাল, মহামারি এল, আর নগরটা চলে গেল আমবাগানের দখলে। 🕌

তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন

লেখা ও পুনর্কথন: আমার পশ্চিমবঙ্গ। লোককথাগুলি আমাদের নিজের ভাষায় নতুন করে বলা; ঐতিহাসিক তথ্য নীচের সূত্র অনুযায়ী। কোনো ভুল চোখে পড়লে আমাদের লিখুন, শুধরে দেব।