ইতিহাস · মানুষ

নেতাজি: যিনি নিজের গৃহবন্দিত্ব থেকে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন

ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সফল হয়ে ইস্তফা দিলেন। পুলিশি পাহারার বাড়ি থেকে পালিয়ে অর্ধেক পৃথিবী পেরিয়ে গড়লেন এক সেনাবাহিনী। তাঁর কাহিনি কীভাবে শেষ হল, ভারত আজও তর্ক করে।

৪ মিনিটে পড়া · হালনাগাদ

কলকাতা, ১৬ জানুয়ারি ১৯৪১-এর রাত। এলগিন রোডের বাড়িটা পুলিশের নজরে; মালিককে কয়েক সপ্তাহ কেউ দেখেনি, শোনা যাচ্ছে তিনি নির্জনে ধর্মসাধনায় আছেন।

শেষরাতে লম্বা কোট, ফেজ টুপি আর ঢোলা পাজামা পরা এক দাড়িওয়ালা মানুষ — কার্ডের নাম অনুযায়ী উত্তর-পশ্চিমের এক বিমা এজেন্ট — বেরিয়ে অপেক্ষমাণ গাড়িতে উঠলেন।

কেউ টের পাওয়ার আগেই সুভাষচন্দ্র বসু উধাও।

সেই পলায়ন, মহানিষ্ক্রমণ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত রাত — আর তা ছিল শুধু শুরু। পরের চার বছরে তিনি আফগানিস্তান পেরিয়ে যাবেন ইউরোপে, সাবমেরিনে অর্ধেক পৃথিবী ঘুরবেন, আর এক সেনাবাহিনী নিয়ে এগোবেন ভারতের দিকে।

কটক, কলকাতা, কেমব্রিজ

সুভাষের জন্ম কটকে, ২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭, আইনজীবী জানকীনাথ বসুর নবম সন্তান। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় ১৯১৬-তে ব্রিটিশ অধ্যাপক ই এফ ওটেনকে নিগ্রহের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কৃত হন, স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে যান কেমব্রিজে। ১৯২০-তে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় চতুর্থ হন — ব্রিটিশ রাজে কোনো ভারতীয়ের পক্ষে সবচেয়ে লোভনীয় চাকরি। পরের বছরই ইস্তফা দেন: ব্রিটিশ সরকারের চাকরি তিনি করতে পারবেন না।

কংগ্রেসের বিদ্রোহী

কলকাতায় ফিরে তিনি হয়ে ওঠেন চিত্তরঞ্জন দাশের স্নেহধন্য, আর বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাদের একজন — ব্রিটিশরা বারবার জেলে পোরে। ১৯৩৮-এ তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩৯-এ গান্ধীজির ইচ্ছার বিরুদ্ধে আবার দাঁড়িয়ে জেতেন, হারান গান্ধীজির প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে। কিন্তু গান্ধী-অনুগামীরা তাঁর সঙ্গে কাজ করতে রাজি হননি; কয়েক মাসের মধ্যে তিনি পদত্যাগ করে গড়েন ফরওয়ার্ড ব্লক।

মহানিষ্ক্রমণ

যুদ্ধ শুরু হলে সুভাষ দেখলেন, ব্রিটেনের বিপদেই ভারতের সুযোগ। ব্রিটিশরা তাঁকে ৩৮/২ এলগিন রোডের বাড়িতে গৃহবন্দি করে। ১৯৪১-এর ১৬–১৭ জানুয়ারির রাতে মহম্মদ জিয়াউদ্দিনের ছদ্মবেশে তিনি বেরিয়ে পড়েন; ভাইপো শিশির গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে দেন গোমো, সেখান থেকে উত্তরের ট্রেন। পেশোয়ার থেকে হেঁটে ঢোকেন আফগানিস্তানে, আর কাবুল থেকে অক্ষশক্তির সাহায্যে পৌঁছন বার্লিনে।

জার্মানি, আর সাবমেরিনে এশিয়া

জার্মানি থেকে তিনি রেডিওতে ভারতের উদ্দেশে বক্তৃতা দেন, গড়েন ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার, আর ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে ইন্ডিয়ান লিজিয়ন। কিন্তু ইউরোপ ভারত থেকে বড্ড দূরে। ১৯৪৩-এর ফেব্রুয়ারিতে তিনি এক জার্মান ইউ-বোটে চড়েন; ভারত মহাসাগরে, মাদাগাস্কারের দক্ষিণ-পূর্বে, মাঝসমুদ্রে তাঁকে তুলে দেওয়া হয় এক জাপানি সাবমেরিনে — যুদ্ধের হাতেগোনা এমন বদলের একটি। ১৯৪৩-এর মে মাসে তিনি নামেন সুমাত্রায়।

আজাদ হিন্দ

সিঙ্গাপুরে তিনি নেতৃত্ব নেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি, আজাদ হিন্দ ফৌজের — জাপানের হাতে বন্দি ভারতীয় সৈন্য আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে গড়া। ২১ অক্টোবর ১৯৪৩ তিনি ঘোষণা করেন আজাদ হিন্দ অস্থায়ী সরকার। এই বাহিনীতে ছিল সে সময়ের হাতেগোনা সম্পূর্ণ মহিলা যোদ্ধা দলের একটি, ঝাঁসির রানি বাহিনী — নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন, পরে লক্ষ্মী সেহগল।

তাঁর ডাক আজও প্রতি ২৩ জানুয়ারি ধ্বনিত হয়: “দিল্লি চলো!”; তাঁর জনপ্রিয় করা অভিবাদন “জয় হিন্দ”; আর ১৯৪৪-এ বর্মায়, “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।”

১৯৪৪-এ আইএনএ জাপানিদের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতে ঢোকে, ইম্ফল আর কোহিমা পর্যন্ত। অনাহার আর বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত সেই অভিযান ব্যর্থ হয়, আর জাপানের যুদ্ধ ভেঙে পড়ার সঙ্গে আইএনএ বর্মা হয়ে পিছু হটে।

আগস্ট ১৯৪৫: কী ঘটেছিল?

জাপানের আত্মসমর্পণের কয়েকদিন পরে জাপানি সংবাদমাধ্যম জানায়, ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ তাইওয়ানের তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে সুভাষ মারা গেছেন। বহু ভারতীয় তা বিশ্বাস করেননি, আর প্রশ্নটির তদন্ত হয়েছে তিনবার:

  • শাহনওয়াজ কমিটি (১৯৫৬) আর খোসলা কমিশন (১৯৭০) — দুটিরই সিদ্ধান্ত, তিনি দুর্ঘটনায় মারা যান।
  • মুখার্জি কমিশন (২০০৫) সিদ্ধান্তে আসে, তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়নি; সরকার সেই রিপোর্ট গ্রহণ করেনি।

তাঁর বলে কথিত চিতাভস্ম রাখা আছে টোকিওর রেনকোজি মন্দিরে। বিতর্ক চলছে, আর এই লেখা তার মীমাংসার ভান করবে না।

যা রেখে গেলেন

যুদ্ধক্ষেত্রে আইএনএ হেরেছিল। রাজনীতিতে হয়তো জিতেছিল। ১৯৪৫–৪৬-এ ব্রিটিশরা যখন তিন আইএনএ অফিসারকে — এক হিন্দু, এক মুসলমান, এক শিখ — লালকেল্লায় বিচারে তোলে, গোটা দেশ তাঁদের পক্ষে ফুঁসে ওঠে, আর অসন্তোষ ছড়ায় খোদ ব্রিটিশ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে। বহু ঐতিহাসিকের মতে, এটিই সেই মুহূর্তগুলির একটি, যখন ব্রিটিশরা বুঝল ভারত আর ধরে রাখা যাবে না।

কলকাতায় তাঁকে কোথায় পাবেন

  • নেতাজি ভবন, ৩৮/২ এলগিন রোড (আজকের লালা লাজপত রায় সরণি): তাঁর ঘর, যেমন ছিল তেমনই, আর সেই ওয়ান্ডারার গাড়ি।
  • নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর — কলকাতার বিমানবন্দর, তাঁর নামে।

সত্যি না গল্প?

উত্তর দেখতে দাবিটির উপর ট্যাপ করুন।

“নেতাজি আইসিএস পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন।”
ভুল ধারণা

১৯২০-তে তিনি চতুর্থ স্থানে পাশ করেন, আর ১৯২১-এ ইস্তফা দেন।

“১৯৪৫-এর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু প্রমাণিত।”
আংশিক সত্যি

দুটি সরকারি তদন্তের সিদ্ধান্ত, হ্যাঁ; তৃতীয়, মুখার্জি কমিশন, বলেছে না, আর সরকার সেই রিপোর্ট খারিজ করেছে। বিষয়টি আজও বিতর্কিত।

ছোট্ট কুইজ

  1. ১. সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম কোথায়?

  2. ২. ১৯৪১-এ কোন নামে তিনি পালান?

  3. ৩. আজাদ হিন্দ ফৌজের মহিলা বাহিনীর নাম কী?

কাউকে পাঠান

নেতাজি গৃহবন্দিত্ব থেকে পালিয়েছিলেন এক বিমা এজেন্টের ছদ্মবেশে — আর যে গাড়িতে বেরিয়েছিলেন, তা আজও তাঁর বাড়িতে রাখা। 🎖️

তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন

লেখা ও পুনর্কথন: আমার পশ্চিমবঙ্গ। লোককথাগুলি আমাদের নিজের ভাষায় নতুন করে বলা; ঐতিহাসিক তথ্য নীচের সূত্র অনুযায়ী। কোনো ভুল চোখে পড়লে আমাদের লিখুন, শুধরে দেব।