শিকাগো, ১১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৩। বিশ্বধর্মমহাসভার উদ্বোধন। গেরুয়া আলখাল্লা আর পাগড়ি পরা এক তরুণ সন্ন্যাসী — অচেনা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বক্তাদের তালিকায় যাঁর নাম ছিল না — বলতে উঠলেন।
“আমেরিকার ভাই ও বোনেরা…”
আর এগোতে পারলেন না। কয়েক হাজার মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে মিনিটের পর মিনিট হাততালি দিয়ে চলল।
সন্ন্যাসীর নাম স্বামী বিবেকানন্দ, বয়স তিরিশ, উত্তর কলকাতার মানুষ। হাতে থাকা ন’বছরে তিনি ভারতীয় দর্শনকে পশ্চিমে নিয়ে যাবেন, গড়বেন রামকৃষ্ণ মিশন, আর এক পরাধীন দেশকে দেবেন নতুন আত্মবিশ্বাস।
নরেন
জন্ম নরেন্দ্রনাথ দত্ত নামে, ১২ জানুয়ারি ১৮৬৩, উত্তর কলকাতার সিমলা পাড়ায়, উকিল পরিবারে। নরেন ছিলেন মেধাবী, অস্থির, গানপাগল আর খেলোয়াড় — চমৎকার গাইতেন, কুস্তি লড়তেন, জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশনে (আজকের স্কটিশ চার্চ কলেজ) পড়তেন পাশ্চাত্য দর্শন। আর তাঁর মনে ছিল এমন এক প্রশ্ন, যার উত্তর কেউ দিতে পারেনি।
“আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন?”
১৮৮১ সালে তিনি দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে গেলেন তার পুরোহিত রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে দেখা করতে, আর সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি ঈশ্বরকে দেখেছেন কি না। রামকৃষ্ণ বললেন, হ্যাঁ — যেমন স্পষ্ট তোমাকে দেখছি, তার চেয়েও গভীরভাবে। নরেন প্রথমে বিশ্বাস করেননি। পরের পাঁচ বছরে, তর্ক করতে করতেই, হয়ে উঠলেন তাঁর সবচেয়ে কাছের শিষ্য।
১৮৮৬-তে রামকৃষ্ণের দেহত্যাগ। নরেন আর কয়েকজন তরুণ শিষ্য সন্ন্যাস নিয়ে বরানগরের এক ভাঙা বাড়িতে থাকতে লাগলেন, প্রায়ই না খেয়ে।
ভারত পরিক্রমা
১৮৮৮ থেকে বিবেকানন্দ পায়ে হেঁটে আর ট্রেনে ঘুরলেন ভারত — প্রায়ই সম্বল শুধু একটা দণ্ড আর ভিক্ষাপাত্র — হিমালয় থেকে দক্ষিণের শেষ বিন্দু পর্যন্ত। যা দেখলেন, দারিদ্র্য আর মানুষ, তা তাঁর মনে গেঁথে রইল। ১৮৯২-এর শেষে কন্যাকুমারীতে সাঁতরে সমুদ্রের এক পাথরে গিয়ে ধ্যানে বসেন; সেখানে আজ বিবেকানন্দ শিলা স্মারক। ঠিক করলেন, আমেরিকা যাবেন।
শিকাগো, ১৮৯৩
বন্ধুদের আর খেতড়ির রাজার অর্থসাহায্যে — যিনি তাঁকে ‘বিবেকানন্দ’ নামটি দেন — তিনি শিকাগো পৌঁছলেন ধর্মসভার আমন্ত্রণপত্র ছাড়া, প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায়। পথে দেখা হওয়া হার্ভার্ডের এক অধ্যাপকের চিঠিতে মিলল প্রবেশের অধিকার। ১১ সেপ্টেম্বরের উদ্বোধনী বক্তৃতা তাঁকে করে তুলল সভার মধ্যমণি, আর পরের কয়েক বছর তিনি আমেরিকা আর ইংল্যান্ড জুড়ে বেদান্ত ও যোগ নিয়ে বক্তৃতা দিলেন।
রামকৃষ্ণ মিশন ও বেলুড় মঠ
১৮৯৭-এ দেশে ফিরলে কলম্বো থেকে কলকাতা তাঁকে বীরের সংবর্ধনা দিল। ১ মে ১৮৯৭ তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন রামকৃষ্ণ মিশন — আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গে সেবা: স্কুল, হাসপাতাল, দুর্ভিক্ষ আর বন্যায় ত্রাণ। ১৮৯৮-এ হুগলির পশ্চিম পাড়ে বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠা করেন সদর দফতর হিসেবে। তার মূল মন্দিরের নকশায় একসঙ্গে মিশেছে গির্জা, মসজিদ আর মন্দিরের আভাস।
তাঁর শিষ্যদের মধ্যে ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা — আয়ারল্যান্ডে জন্মানো মার্গারেট নোবল — যিনি উত্তর কলকাতায় মেয়েদের স্কুল খোলেন, আর ভারতীয় শিল্প, বিজ্ঞান ও জাতীয়তাবাদে নিজেকে সঁপে দেন।
উনচল্লিশ বছর
বিবেকানন্দ বহু বছর অসুস্থ ছিলেন। ৪ জুলাই ১৯০২, বেলুড় মঠে, সকাল কাটালেন ধ্যানে, বিকেল পড়িয়ে, আর সন্ধ্যায় দেহত্যাগ করলেন। বয়স উনচল্লিশ।
কলকাতায় তাঁকে কোথায় পাবেন
- পৈতৃক বাড়ি — সিমলার গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে, রামকৃষ্ণ মিশনের সংস্কার করা সংগ্রহশালা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
- দক্ষিণেশ্বর — যেখানে প্রথম রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা, আর রামকৃষ্ণের থাকার ঘর।
- বেলুড় মঠ — নদীর ওপারে, যেখানে তাঁর দেহত্যাগের ঘর। দক্ষিণেশ্বর থেকে বেলুড়ের লঞ্চই সবচেয়ে ভালো পথ।