১৬ অক্টোবর ১৯০৫, কলকাতা। আজ শহরে কোনো বাড়িতে উনুন জ্বলেনি। ভোর থেকে দলে দলে মানুষ গঙ্গায় স্নান করতে চলেছে, যেন শোকের দিন।
তাদের সঙ্গে হাঁটছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এই দিনের জন্য লেখা গান গাইতে গাইতে। পথে যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে — হিন্দু কি মুসলমান, চেনা কি অচেনা — তার হাতে বেঁধে দিচ্ছেন হলুদ সুতো।
আজ থেকে বড়লাটের হুকুমে বাংলা দুটো প্রদেশ। বাংলা ঠিক করেছে, সে মানবে না।
কার্জন কেন বাংলা ভাগ করলেন
১৯০৫ সালে বাংলা প্রদেশে, যার মধ্যে তখন বিহার আর ওড়িশাও ছিল, প্রায় সাত কোটি আশি লক্ষ মানুষ — সরকারের মতে এত বড় প্রদেশ চালানো অসম্ভব। বড়লাট লর্ড কার্জন জুলাইয়ে ঘোষণা করলেন, প্রদেশ ভাগ হবে: ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গ ও আসাম, আর কলকাতা থেকে শাসিত পশ্চিমের বাংলা, বিহার ও ওড়িশা। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হল ১৬ অক্টোবর ১৯০৫।
প্রশাসনিক যুক্তি মিথ্যে ছিল না, কিন্তু পুরো সত্যিও নয়। বাংলা তখন ভারতের শিক্ষিত জাতীয়তাবাদী মতের কেন্দ্র, আর দাগটা টানা হয়েছিল এমনভাবে যাতে পশ্চিমের প্রদেশে বাংলাভাষীরা সংখ্যালঘু হন, আর পূর্বে মুসলমানেরা সংখ্যাগুরু। ঐতিহাসিকেরা উদ্ধৃত করেন স্বরাষ্ট্রসচিব হার্বার্ট রিজলির ১৯০৪ সালের এক নোট: “ঐক্যবদ্ধ বাংলা এক শক্তি; বিভক্ত বাংলা নানা দিকে টানবে।” বাংলা পরিকল্পনাটা ঠিক এভাবেই পড়েছিল।
বাংলার উত্তর
উত্তর শুরু হয়েছিল বঙ্গভঙ্গের আগেই। ৭ আগস্ট ১৯০৫, কলকাতার টাউন হলে উপচে পড়া সভায় সিদ্ধান্ত হল, বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত বিলিতি পণ্য বর্জন। সেখান থেকেই স্বদেশী আন্দোলনের শুরু।
- অরন্ধন: ১৬ অক্টোবর বাঙালির ঘরে রান্না হয়নি, যেন শোকের দিন।
- রাখিবন্ধন: রবীন্দ্রনাথের ডাকে বাঙালি একে অপরের হাতে রাখি বেঁধেছিল, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে — মানচিত্রের এক দাগে বাংলার মানুষকে ভাগ করা যায় না, এই কথা বলতে।
- বিলিতি কাপড়ের বহ্ন্যুৎসব: রাস্তায় পোড়ানো হল ম্যাঞ্চেস্টারের কাপড়, মানুষ ফিরল তাঁতের কাপড়ে, তা যত মোটাই হোক।
- স্বদেশী উদ্যোগ: খুলল দেশি মালিকানার কাপড়ের কল, ব্যাংক, সাবান আর দেশলাইয়ের কারখানা, স্বদেশী দোকান। কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যাল হয়ে উঠল ভারতীয়রা নিজেরা কী গড়তে পারে, তার প্রতীক।
- জাতীয় শিক্ষা: আন্দোলনে যোগ দেওয়া ছাত্রদের সরকার শাস্তির হুমকি দিলে ১৯০৬ সালে জাতীয়তাবাদীরা গড়লেন জাতীয় শিক্ষা পরিষদ — যা পরে আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
যে আন্দোলন গান গাইত
এত গান খুব কম প্রতিবাদেরই আছে। রবীন্দ্রনাথ এর জন্য একের পর এক গান লেখেন, তার মধ্যে রাখিবন্ধনের দিনের গান ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, আর ‘আমার সোনার বাংলা’ — যা ছেষট্টি বছর পরে হয় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। রজনীকান্ত সেন বাঙালিকে বললেন মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নিতে, আর চারণকবি মুকুন্দ দাস যাত্রাগান নিয়ে সেই বার্তা পৌঁছে দিলেন গ্রামে গ্রামে।
বাংলার মাটি, বাংলার জল,বাংলার বায়ু, বাংলার ফল —পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’-এর ‘বন্দে মাতরম্’ হয়ে উঠল আন্দোলনের স্লোগান। সরকার সার্কুলার জারি করে ছাত্রদের তা উচ্চারণ নিষিদ্ধ করল। একই সময়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আঁকলেন ‘ভারতমাতা’ — মাতৃরূপে ভারতের প্রথম দিকের, আর সবচেয়ে প্রিয়, ছবিগুলির একটি।
বর্জন থেকে বোমা
কারও কারও কাছে বর্জন যথেষ্ট ছিল না। অনুশীলন সমিতি আর যুগান্তরের মতো গুপ্ত সমিতি সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ নিল। ১৯০৮ সালে মুজফফরপুরে এক ঘৃণিত ম্যাজিস্ট্রেটকে লক্ষ্য করে দুই তরুণ এক গাড়িতে বোমা ছোড়েন; তাঁদের একজন, আঠারো বছরের ক্ষুদিরাম বসু, সেই আগস্টে ফাঁসিতে প্রাণ দেন, হয়ে ওঠেন বাংলার সবচেয়ে প্রিয় শহিদ। এর পরের আলিপুর বোমা মামলায় কাঠগড়ায় দাঁড়ান অরবিন্দ ঘোষ।
রদ: ১৯১১
ছ’বছরের প্রতিবাদ সফল হল। ১২ ডিসেম্বর ১৯১১ দিল্লি দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ ঘোষণা করলেন, বঙ্গভঙ্গ রদ, বাংলার বাংলাভাষী জেলাগুলি আবার এক। একই নিঃশ্বাসে ঘোষণা হল, ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরে যাবে দিল্লিতে। বিহার ও ওড়িশা হল আলাদা প্রদেশ, আসাম আবার পৃথক।
১৯০৫ যা রেখে গেল
- আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রথম দিকের এক গণআন্দোলন, যা গান্ধীজির এক প্রজন্ম আগেই বর্জন আর স্বনির্ভরতাকে রাজনৈতিক অস্ত্র করেছিল।
- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বেঙ্গল কেমিক্যাল, আর দেশি উদ্যোগের এক সংস্কৃতি।
- এমন সব গান যা প্রত্যেক বাঙালি আজও জানে, আর এক প্রতিবেশী দেশের জাতীয় সংগীত।
- রাখি — শুধু ভাই-বোনের নয়, দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যেরও প্রতীক।