২৩ জুন ১৭৫৭। ভাগীরথীর পাশে এক আমবাগান, কলকাতা থেকে দেড়শো কিলোমিটার উত্তরে। সকাল থেকে কামান গর্জাচ্ছে।
তারপর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। মাঠের একদিকে কোম্পানির গোলন্দাজেরা বারুদের উপর ত্রিপল চাপা দিল। অন্যদিকে নবাবের গোলন্দাজেরা দিল না।
সন্ধের মধ্যে বাংলার নতুন শাসক ঠিক হয়ে গেল — আর যিনি আসলে জিতলেন, তাঁর মাথায় মুকুট নেই।
পলাশী বড় যুদ্ধ ছিল না। মারা গিয়েছিল বড়জোর কয়েকশো মানুষ। যুদ্ধটা বিখ্যাত তার পরিণামের জন্য: সেই বিকেলের আট বছরের মধ্যে লন্ডনের এক বণিক সংস্থা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, গোটা বাংলার রাজস্ব আদায় করছে — আর বাংলা থেকে তারা দখল করে নেবে ভারত।
তরুণ নবাব
সিরাজউদ্দৌলা বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব হন ১৭৫৬ সালের এপ্রিলে, কুড়ির কোঠার বয়সে, দাদু আলিবর্দি খানের মৃত্যুর পর। তিনি ছিলেন অহংকারী, রাগী আর সন্দেহপ্রবণ — আর কয়েক মাসের মধ্যেই দাদুর আমলের মহাজন, সেনাপতি আর জমিদারদের শত্রু করে ফেলেন।
ইংরেজদের সঙ্গেও তাঁর বিবাদ বাধে। কোম্পানি তাঁর অনুমতি ছাড়া কলকাতায় দুর্গ মজবুত করছিল, আর ১৭৫৬-র জুনে সিরাজ কলকাতা আক্রমণ করে ফোর্ট উইলিয়াম দখল করেন। এক ছোট কুঠুরিতে রাতারাতি কিছু ইংরেজ বন্দির মৃত্যু হয়; বেঁচে ফেরাদের বিবরণে যার নাম ‘অন্ধকূপ হত্যা’ (ব্ল্যাক হোল), ব্রিটেনে তা প্রবাদ হয়ে ওঠে, যদিও ঐতিহাসিকেরা বহুদিন ধরেই তার সংখ্যা নিয়ে সন্দিহান। ১৭৫৭-র জানুয়ারিতে মাদ্রাজ থেকে এসে রবার্ট ক্লাইভ আর অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কলকাতা পুনর্দখল করেন।
ষড়যন্ত্র
পলাশীর ফয়সালা হয়ে গিয়েছিল একটাও গুলি চলার আগে। বাংলার কিছু সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ সিরাজকে সরাতে চাইছিলেন: সিরাজের নিজের সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মীর জাফর; ভারতের সবচেয়ে ধনী মহাজন পরিবার জগৎ শেঠ; বণিক উমিচাঁদ; সেনানায়ক রায়দুর্লভ; আর নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সহ কয়েকজন জমিদার। তাঁরা ক্লাইভের সঙ্গে চুক্তি করলেন: কোম্পানি সিরাজকে সরাবে, মীর জাফর হবেন নবাব, আর কোম্পানি পাবে মোটা টাকা।
তখন উমিচাঁদ হুমকি দিলেন, তিরিশ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি না পেলে সব ফাঁস করে দেবেন। ক্লাইভ বানালেন দুটি চুক্তিপত্র: সাদা কাগজে আসলটা, আর লাল কাগজে উমিচাঁদের টাকা সহ একটা জাল। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন জালটায় সই করতে রাজি হননি, তাই তাঁর সই জাল করা হল। যুদ্ধের পরে উমিচাঁদ জানতে পারলেন, তিনি কিছুই পাবেন না।
যুদ্ধ
কাগজে-কলমে কোনো তুলনাই চলে না। ক্লাইভের ছিল মোটামুটি তিন হাজার সৈন্য: প্রায় সাড়ে সাতশো ইউরোপীয় সৈনিক, একুশশোর মতো ভারতীয় সিপাহি আর কয়েকজন গোলন্দাজ, আটটি কামান। সিরাজের ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার — ভারী কামান, যুদ্ধহাতি, আর ইংরেজ-বিদ্বেষী একদল ফরাসি গোলন্দাজ। (সংখ্যা নিয়ে বিবরণে মতভেদ আছে, কিন্তু প্রতিটিতেই সিরাজ বিপুলভাবে এগিয়ে।)
সকালভর দু’পক্ষে কামানের গোলা চলল। দুপুর গড়াতেই মাঠ জুড়ে নামল প্রবল বৃষ্টি। কোম্পানির সৈন্যরা বারুদ ত্রিপলে ঢেকে রাখল; নবাবের বাহিনী রাখল না, তাদের বারুদ ভিজে গেল। বৃষ্টি থামলে সিরাজের হাতেগোনা অনুগত সেনাপতিদের একজন মীর মদন অশ্বারোহী নিয়ে আক্রমণে ঝাঁপালেন — ভেবেছিলেন ইংরেজদের কামানও তাঁদের মতোই অকেজো। তা ছিল না। কামানের গোলায় তিনি লুটিয়ে পড়লেন।
ভেঙে পড়া সিরাজ মীর জাফরকে ডেকে পাশে থাকার কাতর অনুরোধ করলেন। মীর জাফর কথা দিলেন — আর ক্লাইভকে খবর পাঠালেন এগিয়ে আসতে। রায়দুর্লভ তরুণ নবাবকে পিছু হটার পরামর্শ দিলেন। সিরাজ তাঁর অনুগত সৈন্যদের নিয়ে লড়তে থাকা মোহনলালকে সরে আসার আদেশ দিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দিলেন। পিছনে তাঁর বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। বিকেল পাঁচটার মধ্যে সব শেষ।
সিরাজের পরিণতি
মাঝরাতে মুর্শিদাবাদ পৌঁছে সিরাজ দেখলেন, কেউ পাশে দাঁড়াবে না। নৌকায় উজানে পালালেন। ২ জুলাই রাজমহলের কাছে তাঁকে চিনে ফেলা হয়, ধরিয়ে দেওয়া হয় মীর জাফরের পরিবারের হাতে। সেই রাতেই মীর জাফরের ছেলে মীরনের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। সিরাজউদ্দৌলাকে কবর দেওয়া হয় দাদুর পাশে, মুর্শিদাবাদের নদীর ওপারে খোশবাগে — যেখানে তাঁর সমাধি আজও দেখা যায়।
পলাশীর যুদ্ধের ফল কী হয়েছিল?
জুন ১৭৫৭
ক্লাইভ মুর্শিদাবাদের মসনদে বসান মীর জাফরকে। কোম্পানি পায় কলকাতার দক্ষিণের জমির জমিদারি, যা পরে চব্বিশ পরগনা, আর বিপুল অর্থ; ক্লাইভ নিজে হয়ে ওঠেন ব্রিটেনের অন্যতম ধনী।
১৭৬০
প্রতিশ্রুত টাকা মেটাতে না পারায় মীর জাফরকে সরিয়ে নবাব করা হয় তাঁর জামাই মীর কাশিমকে।
১৭৬৪
মীর কাশিম স্বাধীন হতে চেষ্টা করেন, আর মুঘল সম্রাট ও অযোধ্যার নবাবের সঙ্গে মিলে বক্সারের যুদ্ধে হেরে যান।
১৭৬৫
মুঘল সম্রাট কোম্পানিকে দেন বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি — রাজস্ব আদায়ের অধিকার। এক বণিক সংস্থা কার্যত সরকার হয়ে বসে।
এই কারণেই যুদ্ধটা বিখ্যাত। পলাশী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলার এক বণিক থেকে বাংলার প্রভুতে পরিণত করে, আর বাংলার সম্পদেই কোম্পানি বাকি ভারত জয়ের খরচ জোগায়।
বাঙালির স্মৃতিতে পলাশী
বাংলা পলাশীকে মনে রেখেছে তার মানুষদের দিয়ে। বাংলায় ‘মীরজাফর’ মানেই বিশ্বাসঘাতক — আজও কাউকে বললে সবাই বোঝে। আর সিরাজ, দোষত্রুটি সত্ত্বেও, হয়ে উঠেছেন ট্র্যাজিক নায়ক: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’ তাঁকে বাংলা মঞ্চে সেই আসন দেয়, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর কাহিনি জেনেছে যাত্রা আর সিনেমা থেকে।
পলাশী আর মুর্শিদাবাদ ঘুরে দেখা
- পলাশী, নদিয়া জেলায়, কলকাতা থেকে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার উত্তরে ভাগীরথীর ধারে। আমবাগান কবেই নেই, নদীও সরে গেছে, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে।
- মুর্শিদাবাদ, সিরাজের রাজধানী, সেখান থেকে সহজেই যাওয়া যায়: দেখুন হাজারদুয়ারী ও মুর্শিদাবাদ।
- খোশবাগ — মুর্শিদাবাদের নদীর ওপারের বাগান, যেখানে আলিবর্দি খান আর সিরাজউদ্দৌলার সমাধি।
- নিমকহারাম দেউড়ি — মীর জাফরের প্রাসাদের তোরণকে মুর্শিদাবাদ আজও এই নামেই ডাকে।