ব্লগ · খাবার · শীত

নলেন গুড়: যে মিষ্টি ধরতে হয় সূর্য ওঠার আগে

প্রতি শীতে বাংলার খেজুর গাছ কয়েক সপ্তাহের জন্য রস দেয়। অন্ধকারে গাছে ওঠেন ক্রমশ কমে আসা একদল শিউলি, আর গোটা রাজ্য অপেক্ষা করে নতুন গুড়ের প্রথম হাঁড়ির জন্য।

৭ মিনিটে পড়া · হালনাগাদ

দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক গ্রাম, রাত তিনটে। কোমরে দড়ি বেঁধে, পিঠে মাটির হাঁড়ি নিয়ে একজন খেজুর গাছে উঠছেন। আগের বিকেলে যে হাঁড়ি বেঁধে রেখে গিয়েছিলেন, সেটা এখন রসে ভারী — ঠান্ডা, হালকা ঘোলাটে। ভরা হাঁড়ি নামিয়ে খালি হাঁড়ি বেঁধে তিনি নেমে যান পরের গাছের দিকে।

সূর্য ওঠার আগেই একশো গাছের রস কাঠের আগুনে চওড়া লোহার কড়াইয়ে ফুটতে শুরু করবে, জল থেকে ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে সোনালি। এই হল নলেন গুড় — আর এর একটা সময়সীমা আছে। জ্বাল দেওয়ার আগে রস গরম হয়ে গেলে গেঁজে উঠতে শুরু করে।

নলেন গুড় হল খেজুর গাছের রস আগুনে জ্বাল দিয়ে তৈরি গুড়। সারা বছর যে আখের গুড় পাওয়া যায়, এটা সেই জিনিস নয়। তৈরি হয় শুধু শীতে — এ রাজ্যে মূলত নদিয়া, দুই ২৪ পরগনা আর পশ্চিমের জেলাগুলিতে, সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের যশোর আর ফরিদপুরে। মাস তিনেকের জন্য বাংলার প্রায় সব মিষ্টির স্বাদ বদলে দেয় এই গুড়।

শুধু শীতেই কেন?

বাংলার খেজুর গাছ সবচেয়ে ভাল রস দেয় ঠান্ডার মাসগুলিতে, মোটামুটি ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। রাত ঠান্ডা হতে শুরু করলেই গাছ কাটা শুরু হয়, আর নতুন মরসুমের প্রথম গুড় সাধারণত বাজারে আসে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। চাষি আর গবেষকদের মতে রস ভাল ঝরতে রাতের তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি বা তার নীচে নামা দরকার। শীত গরম হলে রস কমে, স্বাদও পাতলা হয়।

ঠান্ডার দরকার অন্য দিক থেকেও। টাটকা রসে প্রচুর চিনি আর বুনো ইস্ট। গরম হাঁড়িতে পড়ে থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গেঁজে তাড়ি হয়ে যায়। তাই রস নামানো হয় রাতভর আর ভোররাতে, আর জ্বাল দেওয়া হয় সেই সকালেই।

কীভাবে তৈরি হয়

  1. গাছ কাটা

    বিকেলে শিউলি (কোথাও বলে গাছি) গাছে উঠে মাথার ঠিক নীচে কাণ্ড থেকে পাতলা একফালি চেঁছে তোলেন। বাঁশ বা নলের ছোট্ট একটা নালি রসকে টেনে নিয়ে যায় নীচে ঝোলানো মাটির হাঁড়িতে। কাটা খুব অগভীর হলে রস কম; খুব গভীর হলে গাছের ক্ষতি।

  2. রাত

    ঠান্ডা রাত জুড়ে ফোঁটা ফোঁটা রস জমে হাঁড়িতে। জয়নগরে শিউলিরা রস নামান রাত তিনটে থেকে সকাল আটটার মধ্যে। ভরা মরসুমে একটা ভাল গাছ এক রাতে কয়েক লিটার রসে হাঁড়ি ভরিয়ে দেয়।

  3. জ্বাল

    রস ছেঁকে চওড়া, অগভীর কড়াইয়ে কাঠের আগুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া হয়, নাড়তে নাড়তে, গাদ তুলতে তুলতে। এক লিটার গুড়ের জন্য কয়েক লিটার রস লাগে — জয়নগরের এক হিসেবে প্রায় সাত লিটার।

  4. তরল না শক্ত

    ঢালা যায় এমন অবস্থায় আঁচ থেকে নামালে হয় পাতলা ঝোলা গুড়। আরও ফুটিয়ে, ঘুঁটে, ছাঁচে ঢাললে জমে হয় পাটালি — শীতের প্রতিটি হাটে থাক দিয়ে সাজানো গোল চাকতি।

দোকানিরা নামগুলি খুব ঢিলেঢালাভাবে ব্যবহার করেন। কী কিনছেন, জিজ্ঞেস করে নিন।
নামকীকীসে লাগে
নলেন গুড়নতুন মরসুমের গুড়। সাধারণত বোঝায় প্রথম দিকের, সবচেয়ে ভাল তরল গুড়সন্দেশ, রসগোল্লা, পায়েস, রুটি বা ভাতের সঙ্গে
ঝোলা গুড়পাতলা তরল গুড়পায়েস, পিঠে, উপর থেকে ঢালতে
পাটালি গুড়ছাঁচে জমানো শক্ত চাকতিবেশি দিন রাখতে, মিষ্টিতে কুরে দিতে, এমনি খেতে

খুব পুরনো এক মিষ্টি

বাংলায় খেজুর গুড়ের ইতিহাস দীর্ঘ। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙ্গালীর ইতিহাস-এ এর উল্লেখ খুঁজে পেয়েছেন সদুক্তিকর্ণামৃতে। বইটি সংস্কৃত শ্লোকের সংকলন, বাংলায় শ্রীধরদাস সংকলন করেন মোটামুটি ১২০৫ সালে। উনিশ শতকে খেজুরের চিনি রীতিমতো শিল্প হয়ে ওঠে: যশোরের গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছিল একশোরও বেশি কারখানা, আর সে অঞ্চলে আজও বলে “যশোরের যশ, খেজুরের রস”।

কীসে খাবেন

নলেন গুড়ের সন্দেশ

Nolen gurer sandesh

চিনির বদলে নলেন গুড়ে পাক করা ছানা — রং হয় নরম বাদামি, স্বাদে আসে ধোঁয়াটে ক্যারামেলের আভাস। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে কলকাতার প্রতিটি মিষ্টির দোকানের নিজস্ব সংস্করণ, আর কার সন্দেশ সেরা, তা নিয়ে আনুগত্য গভীর।

নলেন গুড়ের রসগোল্লা

Nolen gurer rosogolla

চিনির রসের বদলে গুড়ের রসে ডোবানো রসগোল্লা: বাদামি, স্বাদে নরম, আর বহু বাঙালির কাছে শীত আসার আসল প্রমাণ।

জয়নগরের মোয়া

Joynagar moa

কনকচূড় ধানের খই — এক সুগন্ধি দেশি ধান থেকে — নলেন গুড়ে বেঁধে, সঙ্গে খোয়া ক্ষীর, ঘি, এলাচ আর দু-একটা কিশমিশ। মূল দুটো উপকরণই শুধু শীতের, তাই আসল মোয়া নভেম্বর থেকে জানুয়ারির জিনিস। ২০১৫ সালে জয়নগরের মোয়া ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) তকমা পায়। জয়নগর আর পাশের বহড়ু, দুই জায়গার কারিগরেরাই মোয়াকে নিজেদের বলে দাবি করেন। একটি প্রচলিত বিবরণ বলে, ১৯০৪ সালে আশুতোষ দাস নামে এক মোয়া-বিক্রেতা প্রথম নলেন গুড়ের মোয়া বানান।

পিঠে-পায়েস

Pithe & payesh

মধ্য-জানুয়ারির পৌষ সংক্রান্তিতে বাঙালি রান্নাঘরে পিঠে হয়: নারকেল-গুড়ের পুর দেওয়া পাটিসাপটা, পুলি, গোকুল পিঠে, আর গুড়ের পায়েস। পায়েসে ঝোলা গুড় দিতে হয় আঁচ থেকে নামানোর পরে, নইলে দুধ কেটে যায়।

ভাল নলেন গুড় কেনা

চাহিদা জোগানকে ছাড়িয়ে গেছে। শিউলিদের বয়স বাড়ছে, সংখ্যা কমছে: ২০২১ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী জয়নগর এলাকায় পাঁচ বছরে শিউলি ৮০০ থেকে কমে প্রায় ২০০। ২০২০-র ঘূর্ণিঝড় আমফান বহু খেজুর গাছ উপড়ে দিয়েছে, আর গরম শীতে রস কমছে। কিছু কারিগর চিনির রস মিশিয়ে গুড় বাড়ান। গুড় খাঁটি কি না, রান্নাঘরে বসে প্রমাণ করার কোনও পরীক্ষা নেই — তবে কয়েকটা জিনিস কাজে দেয়:

  • মরসুমে কিনুন। অক্টোবর বা জুনে “টাটকা” নলেন গুড় মানে গত মরসুমের, নয়তো নলেনই নয়।
  • নাকের উপর ভরসা রাখুন। ভাল গুড়ে ধোঁয়াটে, ক্যারামেলের মতো গন্ধ, খানিকটা কাঠের আগুনের মতো। শুধু চিনির মতো সাদামাটা মিষ্টি হলে সন্দেহ করুন।
  • পাটালি দেখুন। খুব ফ্যাকাশে, খুব শক্ত, কাচের মতো চকচকে আর স্বাদে প্রায় শুধুই চিনি — এমন পাটালিতে প্রায়ই চিনি মেশানো থাকে।
  • কারিগরের খোঁজ নিন। যে বিক্রেতা গ্রাম আর কারিগরের নাম বলতে পারেন, তিনি লেবেলহীন বয়ামের চেয়ে ভরসাযোগ্য।
  • ঠান্ডায় রাখুন। ঘরের তাপমাত্রায় ঝোলা গুড় গেঁজে যেতে পারে; ফ্রিজে রাখুন, শুকনো পরিষ্কার চামচ ব্যবহার করুন। পাটালি বায়ুরোধী কৌটোয় বেশি দিন থাকে।

লোকে যা জিজ্ঞেস করেন

নলেন গুড় কী দিয়ে তৈরি?

খেজুর গাছের রস, আগুনে জ্বাল দিয়ে ঘন করা। আখের গুড়ের থেকে আলাদা।

নলেন গুড় কখন পাওয়া যায়?

মোটামুটি ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারি, যখন ঠান্ডা রাতে খেজুর গাছ রস দেয়। এই গুড়ের মিষ্টি কলকাতার দোকানে আসে ডিসেম্বর থেকে, সবচেয়ে ভাল থাকে জানুয়ারিতে।

নলেন, ঝোলা আর পাটালি গুড়ে তফাত কী?

ঝোলা হল পাতলা তরল গুড়; পাটালি আরও ফুটিয়ে ছাঁচে জমানো। নলেন মানে নতুন মরসুমের গুড়, সাধারণত প্রথম দিকের সবচেয়ে ভাল তরল গুড়কে বোঝায়।

নলেন গুড় কি চিনির চেয়ে স্বাস্থ্যকর?

সামান্যই। পরিশোধিত চিনিতে যা নেই, এমন কিছু খনিজ অল্প পরিমাণে আছে, কিন্তু এটাও মূলত চিনি, আর রক্তে শর্করার উপর প্রভাবও প্রায় এক। ডায়াবেটিস থাকলে একে চিনির মতোই ধরুন।

টাটকা খেজুর রস খাওয়া কি নিরাপদ?

কাঁচা নয়। বাদুড় থেকে রসে নিপা ভাইরাস আসতে পারে, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টাটকা খেজুর রস ফুটিয়ে খেতে বলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোটানো গুড়ে এই ঝুঁকি নেই।

সত্যি না গল্প?

উত্তর দেখতে দাবিটির উপর ট্যাপ করুন।

““নলেন” কথাটা এসেছে নল থেকে — যে বাঁশের নালি দিয়ে রস নামে।”
আংশিক সত্যি

ব্যাখ্যাটা জনপ্রিয়, তবে প্রমাণিত নয়। নলেন গুড়ের সবচেয়ে চলতি অর্থ “নতুন গুড়”, মরসুমের প্রথম গুড় — বেশিরভাগ বাঙালি কথাটা এই অর্থেই বলেন। নালির ব্যাখ্যাটা লোকমুখে তৈরি হতে পারে।

“নলেন গুড় চিনির স্বাস্থ্যকর বিকল্প।”
আংশিক সত্যি

এতে সামান্য আয়রন, পটাশিয়াম আর অন্য খনিজ আছে, কিন্তু ওজনের হিসেবে এটা প্রায় পুরোটাই চিনি, আর রক্তে শর্করা বাড়ায় চিনির মতোই। শখ করে খান, ওষুধ ভেবে নয়।

“নলেন গুড় খেয়ে নিপা হতে পারে।”
ভুল ধারণা

গুড় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোটানো হয়। প্রমাণিত ঝুঁকি বাদুড়ে দূষিত কাঁচা খেজুর রস খাওয়ায়; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টাটকা রস ফুটিয়ে খেতে বলে।

ছোট্ট কুইজ

  1. ১. নলেন গুড়ের রস আসে কোন গাছ থেকে?

  2. ২. রস রাতে নামিয়ে সেই সকালেই জ্বাল দেওয়া হয় কেন?

  3. ৩. জয়নগরের মোয়ায় নলেন গুড় ছাড়া মূল উপকরণ কী?

কাউকে পাঠান

নলেন গুড়ের একটা সময়সীমা আছে: খেজুর রস গরম হলেই গেঁজে ওঠে, তাই নামানো হয় অন্ধকারে, জ্বাল পড়ে রোদ চড়ার আগে। 🍯

তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন

লেখা: আমার পশ্চিমবঙ্গ। শুরুতে দেওয়া তারিখে উপরের সূত্রগুলির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। ট্রেনের সময়, অনুমতির নিয়ম আর মেলার তারিখ বছর-বছর বদলায়, তাই রওনা হওয়ার আগে রেল বা সরকারি সাইটে একবার দেখে নেবেন। কিছু পুরনো হয়ে গেছে দেখলে আমাদের লিখুন, ঠিক করে দেব।