প্রতি ডিসেম্বরে কলকাতার কোনও না কোনও বসার ঘরে একই তর্ক বাধে। কেউ চায় সমুদ্র। কেউ পৌষমেলার শান্তিনিকেতন। কারও মা চান এমন জায়গা, যেখানে সিঁড়ি ভাঙতে হবে না। উইকেন্ড মোটে দু-দিনের, আর হাওড়া স্টেশন এর মধ্যেই ঠাসা।
সুখবর হল, শহর থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ আশ্চর্য রকম দরাজ। হাতের কাছেই আছে একটা ফরাসি শহর, ম্যানগ্রোভের জঙ্গল, টেরাকোটার মন্দির, হাজার দরজার এক প্রাসাদ, আর এমন এক ফাঁকা সমুদ্রতট যেখানে মানুষের চেয়ে লাল কাঁকড়া বেশি।
এর প্রায় সবকটার মরসুম শীত, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। গরম আর ভ্যাপসা ভাব কমে, সমুদ্র শান্ত থাকে, জঙ্গলে হাঁটা যায়, আর ঠিক মাঝখানে পড়ে পৌষের মেলাগুলি। নীচে বারোটা সফর, হাতে কত সময় সেই হিসেবে ভাগ করা। সময়গুলি মধ্য কলকাতা থেকে মোটামুটি হিসেব — যানজট আর ট্রেনের সময়ের উপর অনেকটাই নির্ভর করে।
এক নজরে
| সফর | কলকাতা থেকে সময় | কীসের জন্য |
|---|---|---|
| চন্দননগর আর ব্যান্ডেল | লোকাল ট্রেনে ঘণ্টাখানেক | নদী, ফরাসি ইতিহাস আর পুরনো গির্জায় একটা দিন |
| চন্দ্রকেতুগড় | সড়কে দেড় ঘণ্টার মতো | মাটির নীচের বন্দর-নগর আর গ্রামের সংগ্রহশালা |
| টাকি | লোকাল ট্রেনে আড়াই ঘণ্টার মতো | বাংলাদেশের মুখোমুখি, ইছামতীর পাড়ে নিরিবিলি দিন |
| শান্তিনিকেতন | ট্রেনে ঘণ্টা তিনেক | রবীন্দ্রনাথ, শনিবারের হাট, পৌষমেলা |
| বিষ্ণুপুর | ট্রেনে বা সড়কে ঘণ্টা চারেক | টেরাকোটার মন্দির আর বালুচরি শাড়ি |
| মন্দারমণি আর দিঘার উপকূল | সড়কে ঘণ্টা চারেক | সমুদ্রের সপ্তাহান্ত |
| বকখালি | সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো | সস্তা, নিরিবিলি সৈকত |
| সুন্দরবন | নৌকা পর্যন্ত ঘণ্টা তিনেক | ম্যানগ্রোভ, পাখি, ভাগ্যে থাকলে বাঘ |
| ঝাড়গ্রাম | ট্রেনে ঘণ্টা তিনেক | শালবন আর তিরিশের দশকের রাজবাড়ি |
| মুকুটমণিপুর | ঘণ্টা পাঁচেক | পাহাড়ে ঘেরা বিশাল জলাধার |
| মুর্শিদাবাদ | ট্রেনে ৪-৫ ঘণ্টা | নবাবদের রাজধানী |
| পুরুলিয়া | ঘণ্টা ছয়েক | পাহাড়, ঝরনা আর কনকনে সকাল |
একদিনের সফর (রাতের খাওয়ার আগে বাড়ি)
চন্দননগর আর ব্যান্ডেল
Chandannagar & Bandel · হুগলি
কলকাতা থেকে হুগলি নদী ধরে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার উজানে চন্দননগর। সতেরো শতকের শেষ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত ছিল ফরাসি উপনিবেশ। নদীর ধারে গাছে ছাওয়া, প্রায় ৭০০ মিটার লম্বা স্ট্র্যান্ড ধরে হাঁটুন। দেখুন ১৮৮৪ সালে উদ্বোধন হওয়া স্যাক্রেড হার্ট চার্চ, আর ইনস্টিটিউট দ্য শন্দেরনগরের ফরাসি আমলের সংগ্রহ। নভেম্বরে এই শহরেই হয় পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জমকালো জগদ্ধাত্রী পুজো, আলোর কারসাজির জন্য বিখ্যাত।
একই লাইনে আরও কয়েকটা স্টেশন পরে ব্যান্ডেলে পর্তুগিজদের প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডেল চার্চ, আর পাশের হুগলি শহরে নদীর ধারে ইমামবাড়া।
- যাওয়ার পথ
- হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল লাইনের লোকাল ট্রেন
- জেনে রাখুন
- নদী সবচেয়ে সুন্দর পড়ন্ত বিকেলে
চন্দ্রকেতুগড়
Chandraketugarh · উত্তর ২৪ পরগনা
কলকাতা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বেড়াচাঁপার চারপাশে কয়েকটা গ্রাম। তাদের নীচে শুয়ে আছে এক বন্দর-নগর, যেখানে অন্তত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে হাজার বছরেরও বেশি মানুষ থেকেছে। এখানকার চাষিরা পুরুষানুক্রমে লাঙলের ফলায় টেরাকোটার মূর্তি তুলে আসছেন। পুরো গল্প আমাদের চন্দ্রকেতুগড়ের লেখায়।
- যাওয়ার পথ
- গাড়িতে; স্থানীয় কাউকে সঙ্গে না নিলে দেখার বিশেষ কিছু নেই, তাই গ্রামের সংগ্রহশালায় খোঁজ নিন
টাকি
Taki · উত্তর ২৪ পরগনা
ইছামতীর পাড়ে পুরনো জমিদারি শহর। নদীটা এখানে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমানা — ওপারটা অন্য দেশ। ঘাটে বসে ঢিমে তালে একটা দিন আর একটা নৌকাভ্রমণের জন্য আসুন। টাকির সবচেয়ে বড় পরিচিতি বিজয়া দশমী, যেদিন দুই পাড়ের প্রতিমা একই নদীতে ভাসে; তবে শীতে শহরটা শান্ত, নিরিবিলি।
- যাওয়ার পথ
- শিয়ালদা থেকে লোকাল ট্রেনে টাকি রোড, তারপর টোটো
এক রাতের সফর
শান্তিনিকেতন
Santiniketan · বীরভূম
রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববিদ্যালয়-শহর, কলকাতা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে। ২০২৩ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় উঠেছে। বিশ্বভারতীর চত্বর আর উত্তরায়ণ ঘুরে দেখুন, সোনাঝুরির শনিবারের হাটে ঘুরুন, কোপাইয়ের ধারে আমার কুটিরে যান।
পৌষমেলা শুরু হয় ৭ পৌষ, মোটামুটি ২৩ ডিসেম্বর, চলে কয়েক দিন, পূর্বপল্লির মাঠে। ২০২৪ আর ২০২৫ সালে চলেছিল ২৩ থেকে ২৮ ডিসেম্বর। ঘর ভরে যায় মাসখানেক আগেই, তাই আগে বুক করুন, নয়তো বোলপুরে থাকুন।
- যাওয়ার পথ
- হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে বোলপুর শান্তিনিকেতনের ট্রেন
- সময়
- ট্রেনে ঘণ্টা তিনেক
বিষ্ণুপুর
Bishnupur · বাঁকুড়া
মল্ল রাজাদের পুরনো রাজধানী। ইটের মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার ফলকে রামায়ণ, মহাভারত আর কৃষ্ণলীলা। পুরো একটা দিনে রাসমঞ্চ, শ্যামরায়, জোড়বাংলা, মদনমোহন আর দলমাদল কামান হয়ে যায়; পরের দিন সকালে বালুচরির তাঁতিদের কাছে যাওয়া যায়। কারুশিল্প আর গানের বিষ্ণুপুর মেলা বসে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। মন্দিরগুলির পিছনের গল্প আমাদের বিষ্ণুপুরের লেখায়।
- যাওয়ার পথ
- হাওড়া বা সাঁতরাগাছি থেকে ট্রেন, অথবা আরামবাগ হয়ে সড়কপথে
মন্দারমণি আর দিঘার উপকূল
Mandarmani · পূর্ব মেদিনীপুর
১৩ কিলোমিটারের সৈকত, হাঁটলে পায়ের সামনে থেকে লাল কাঁকড়া ছুটে পালায়, বালির ধার ঘেঁষে সারি সারি রিসর্ট। পাশের দিঘায় ভিড় বেশি, যানবাহনও সবচেয়ে বেশি; মাঝখানের তাজপুর আর শংকরপুর অনেক শান্ত। শীতে সমুদ্র ঠান্ডা মেজাজে থাকে, আর রোদ এতটাই নরম যে গোটা বিকেল বালিতে কাটানো যায়।
- যাওয়ার পথ
- সড়কে সাড়ে ৩-৪ ঘণ্টা; অথবা কাঁথি বা দিঘা পর্যন্ত ট্রেন, তারপর গাড়ি
- সাবধান
- সৈকতে গাড়ি চালানো ঝুঁকির, আর জোয়ার আসে খুব দ্রুত
বকখালি
Bakkhali · দক্ষিণ ২৪ পরগনা
হুগলির মোহনার কাছে লম্বা, সমতল সৈকত। ঝাউবন, সাদামাটা হোটেল, পাশেই ফ্রেজারগঞ্জের মাছধরার বন্দর। দিঘার মতো চকচকে নয়, অনেক বেশি নিরিবিলি।
- যাওয়ার পথ
- শিয়ালদা থেকে লোকাল ট্রেনে নামখানা, তারপর সড়কপথে
সুন্দরবন
Sundarbans · দক্ষিণ ২৪ পরগনা
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করা। ভারতের অংশটি ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ওঠে। বেশিরভাগ সফরের নৌকা ছাড়ে গদখালি থেকে — কলকাতা থেকে সড়কে ঘণ্টা তিনেক। রাত কাটে জলে, নয়তো জনবসতির কোনও দ্বীপের লজে; পথে সজনেখালির নজরমিনার আর আরও কয়েকটা। কুমির, মাছরাঙা, চিতল হরিণ দেখবেনই। বাঘ দেখা উপহার, প্রতিশ্রুতি নয়।
- অনুমতি
- ব্যাঘ্র প্রকল্পে ঢুকতে লাগে; বেশিরভাগ ট্যুরের নৌকা ব্যবস্থা করে দেয়
- সেরা সময়
- নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি
ঝাড়গ্রাম
Jhargram · ঝাড়গ্রাম
পশ্চিমের মালভূমির শালবনের মধ্যে একটা শহর। মল্লদেব রাজাদের জন্য ১৯৩১ সালে ইন্দো-সারাসেনিক ধাঁচে গড়া ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি দাঁড়িয়ে ২৩ একর জমির মধ্যে। গাড়ি নিয়ে ডুলুং নদীর ধারে চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দিরে যান, আর দ্বিতীয় দিন হাতে থাকলে বেলপাহাড়ির পাহাড়-জঙ্গলে।
- যাওয়ার পথ
- হাওড়া থেকে ট্রেন, প্রায় ১৫৫ কিমি; সড়কে ১৬৯ কিমি
দু-রাত বা তার বেশি
মুকুটমণিপুর
Mukutmanipur · বাঁকুড়া
কংসাবতী আর কুমারী নদীর সঙ্গমে বিশাল জলাধার, আটকে রেখেছে ১০.৮ কিলোমিটার লম্বা মাটির বাঁধ। সূর্যাস্তের সময় বাঁধের উপর দিয়ে হাঁটুন, নৌকায় দ্বীপগুলিতে যান, আর প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরের অম্বিকানগর দেখে আসুন — একসময়ের জৈন তীর্থ।
- যাওয়ার পথ
- বাঁকুড়া পর্যন্ত ট্রেন, তারপর খাতড়া হয়ে সড়কপথে
মুর্শিদাবাদ
Murshidabad
বাংলার নবাবদের রাজধানী: হাজার দরজার হাজারদুয়ারি (তার কিছু নকল), কাটরা মসজিদ, নিজামত ইমামবাড়া, আর ভাগীরথী পেরিয়ে খোশবাগ, যেখানে সিরাজউদ্দৌলার সমাধি। দু-রাত থাকলে তাড়াহুড়ো ছাড়াই দেখা যায়। গল্পটা আমাদের হাজারদুয়ারির লেখায়।
- যাওয়ার পথ
- শিয়ালদা বা কলকাতা স্টেশন থেকে মুর্শিদাবাদের ট্রেন
পুরুলিয়া
Purulia
এই তালিকার সবচেয়ে দূরের, আর সবচেয়ে আলাদা: ছোটনাগপুর মালভূমির লাল মাটি, নিচু পাহাড়, ঝরনা আর ছৌ-মুখোশের কারিগর। সবচেয়ে পরিষ্কার দেখায় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। রাস্তা আর তিন দিনের প্ল্যান-সহ শীতের পুরুলিয়ার পুরো গাইড আছে।
- যাওয়ার পথ
- সাঁতরাগাছি থেকে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস, অথবা বাঁকুড়া হয়ে সড়কপথে
শীতের যে মেলাগুলির তারিখ মিলিয়ে বেরোনো যায়
| মেলা | কোথায় | কবে |
|---|---|---|
| জগদ্ধাত্রী পুজো | চন্দননগর | নভেম্বর, কালীপুজোর দিন দশেক পরে |
| পৌষমেলা | শান্তিনিকেতন | ৭ পৌষ থেকে, মোটামুটি ২৩ ডিসেম্বর |
| বিষ্ণুপুর মেলা | বিষ্ণুপুর | ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ |
| জয়দেব কেঁদুলির মেলা | কেঁদুলি, বীরভূম, অজয়ের পাড়ে | পৌষ সংক্রান্তি, ১৪-১৬ জানুয়ারি নাগাদ; বাউলদের সবচেয়ে বড় সমাবেশ |
| গঙ্গাসাগর মেলা | সাগরদ্বীপ | মকর সংক্রান্তি, মধ্য-জানুয়ারি; বিপুল ভিড়, ফেরির হিসেব আগে থেকে কষুন |
| টুসু পরব | পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম | গোটা পৌষ মাস, শেষ মকর সংক্রান্তিতে |
লোকে যা জিজ্ঞেস করেন
কলকাতা থেকে একদিনে কোথায় ঘুরে আসা যায়?
হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে চন্দননগর আর ব্যান্ডেল, সড়কপথে চন্দ্রকেতুগড়, অথবা শিয়ালদা থেকে লোকাল ট্রেনে টাকি। তিনটে থেকেই রাতের খাওয়ার আগে ফেরা যায়।
কলকাতা থেকে দু-দিনের জন্য কোথায় যাব?
শান্তিনিকেতন, বিষ্ণুপুর, মন্দারমণি, বকখালি, সুন্দরবন বা ঝাড়গ্রাম — যে-কোনওটা এক রাতের সফরে হয়ে যায়। দু-রাত থাকলে মুকুটমণিপুর, মুর্শিদাবাদ বা পুরুলিয়া।
কলকাতার কাছে সবচেয়ে ভাল সমুদ্রসৈকত কোনটা?
লম্বা, নিরিবিলি সৈকত আর রিসর্টের জন্য মন্দারমণি; যানবাহন আর ভিড়ের জন্য দিঘা; শান্তির জন্য তাজপুর আর শংকরপুর; কম খরচে সাদামাটা থাকার জন্য বকখালি। সবকটাই শীতে সবচেয়ে শান্ত।
পৌষমেলা কবে?
বাংলা পঞ্জিকার ৭ পৌষ, মোটামুটি ২৩ ডিসেম্বর শুরু হয়, চলে কয়েক দিন। ২০২৪ আর ২০২৫ সালে পূর্বপল্লির মাঠে চলেছিল ২৩ থেকে ২৮ ডিসেম্বর।