জানুয়ারির গোড়া, অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় সকাল সাতটা। চায়ের দোকানে কাঠের আগুনে কেতলি চাপানো, নীচের উপত্যকায় কুয়াশা এখনও শুয়ে আছে, আর বেঞ্চে বসা সবার মাথায় মাঙ্কি টুপি — শুধু চা-ওলা ছাড়া।
এগারোটার মধ্যে কুয়াশা উধাও। আকাশ এমন গাঢ় নীল, কলকাতায় যা কখনও চোখে পড়ে না। রোদে লাল মাটি প্রায় কমলা। এই পুরুলিয়ার টানেই মানুষ বারবার ফেরে।
পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে পশ্চিমের জেলা। এখানে গাঙ্গেয় সমভূমি শেষ হয়ে শুরু হয়েছে ছোটনাগপুর মালভূমি — নিচু পাহাড়, শালবন, ল্যাটেরাইটের লাল মাটি। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বরের আগে এই অঞ্চল ছিল বিহারের মানভূম জেলার অংশ; সেদিন বাংলাভাষী অংশটুকু পশ্চিমবঙ্গে আসে। সাঁওতাল, ভূমিজ, কুড়মি-সহ নানা সম্প্রদায়ের বাস এখানে। পুরুলিয়ার ছৌ নাচের ঘরও এই জেলা — ২০১০ সালে ইউনেস্কো এই মুখোশ-নাচকে বিশ্বের অধরা ঐতিহ্যের তালিকায় তুলেছে।
“পুরুলিয়া ঘুরতে যাচ্ছি” বললে বেশিরভাগ লোক বোঝায় জেলার দক্ষিণের অযোধ্যা পাহাড়, আর তার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে কয়েকটা বাঁধ, ঝরনা আর ভাঙা গড়। নীচে প্রতিটি জায়গা কী, কীভাবে একসঙ্গে সাজাবেন, আর কখন যাবেন — তার সোজাসাপটা উত্তর।
কখন যাবেন: শীতে না বসন্তে?
পুরুলিয়ার দুটো মরসুম। শীত (ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ঠান্ডা আর শুকনো। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে জেলার রাতের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১-১২ ডিগ্রির আশেপাশে। পাহাড়ের মাথায় আর খোলা মাঠে ভোরের দিকে আরও ঠান্ডা লাগে। দিনগুলি ঝকঝকে, হাঁটার পক্ষে আরামের।
বসন্তে (ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চ) পলাশ ফোটে, পাহাড় আগুনরঙা হয়ে ওঠে — পুরুলিয়ার প্রতিটি পোস্টারের ছবি এটাই। তবে মার্চেই দুপুর বেশ গরম। হাঁটা, পাহাড়ে চড়া আর ঝরনায় খানিক জল দেখতে চাইলে শীতে যান। পলাশই যদি আসল উদ্দেশ্য হয়, মার্চের গোড়ায় যান, গরমটা মেনে নিয়ে। এপ্রিল থেকে জুন এই জেলা রাজ্যের সবচেয়ে গরম জায়গাগুলির একটা। বর্ষায় (জুন-সেপ্টেম্বর) সব সবুজ হয় ঠিকই, কিন্তু পাহাড়ি রাস্তা পিছল।
কলকাতা থেকে যাওয়ার পথ
| কীভাবে | পথ | সময় |
|---|---|---|
| ট্রেন | রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ভোরে সাঁতরাগাছি ছেড়ে দুপুর নাগাদ পুরুলিয়া জংশনে পৌঁছয়। ফেরার ট্রেন পুরুলিয়া ছাড়ে বিকেলে, হাওড়া পৌঁছয় রাতে। আদ্রা আর আসানসোল হয়েও ট্রেন আছে। | মোটামুটি সাড়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা |
| সড়কপথ | দুর্গাপুর-বাঁকুড়া হয়ে, অথবা আসানসোল হয়ে। কলকাতা থেকে পুরুলিয়া শহর সড়কপথে ৩০০ কিলোমিটারের সামান্য বেশি। | ৬-৭ ঘণ্টা |
| পুরুলিয়া শহর থেকে অযোধ্যা | পুরুলিয়া শহর বা বলরামপুর স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করুন। বলরামপুর থেকে মাঠা হয়ে পাহাড়ের মাথা প্রায় ৪০ কিলোমিটার। | দেড় ঘণ্টা |
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার বাস প্রায় নেই। তাই প্রায় সবাই পুরো সফরের জন্য চালক-সহ একটা গাড়ি নেন। রওনা হওয়ার আগে রুট আর ভাড়া পাকা করে নিন।
অযোধ্যা পাহাড় আর মালভূমি
অযোধ্যা পাহাড়ের মাথা
Ajodhya hilltop
চূড়া নয়, আসলে একটা মালভূমি। অযোধ্যা পাহাড়শ্রেণি দলমা পাহাড়ের একটা শাখা, সবচেয়ে উঁচু জায়গাগুলিও ৭০০ মিটারের আশেপাশে। পাহাড়ের মাথার গ্রামটাই বেশিরভাগ লোকের থাকার ঘাঁটি — লজ, বাজার, আর চারদিকে জঙ্গলের দৃশ্য। বহু বাঙালি পর্বতারোহীর প্রথম রক ক্লাইম্বিং শেখা এখানেই।
নামটার সঙ্গে রামায়ণ জুড়ে আছে লোকবিশ্বাসে: সীতাকুণ্ডে নাকি সীতার তেষ্টা মেটাতে রাম মাটিতে তির ছুড়েছিলেন, আর জল উঠে এসেছিল। এটা কিংবদন্তি, ইতিহাস নয় — তবে ঝরনাটা সত্যি, লোকে আজও দেখতে যায়।
- কীসের জন্য
- সূর্যোদয়, হাঁটা, বাকি সব ঘোরার ঘাঁটি
- কাছের স্টেশন
- বলরামপুর (প্রায় ৪০ কিমি)
ময়ূর পাহাড়
Mayur Pahar
পাহাড়ের মাথা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার, ছোট্ট একটা চড়াই। মালভূমির সেরা খোলা দৃশ্যগুলির একটা এখান থেকে। ভোরে বা বিকেলে যান; ভরদুপুরে আলো ম্যাড়মেড়ে।
আপার ড্যাম, লোয়ার ড্যাম আর মার্বেল লেক
Upper Dam, Lower Dam, Marble Lake
অযোধ্যার রাস্তার দুটো বড় জলাধার আসলে পুরুলিয়া পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্পের অংশ। ৯০০ মেগাওয়াটের এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারটি ইউনিট চালু হয় ২০০৭-০৮ সালে। রাতে নীচের জলাধার থেকে জল পাম্প করে উপরে তোলা হয়, আর চাহিদার সময় সেই জল টারবাইনের মধ্যে দিয়ে নামিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। রাজ্যের গ্রিডের জন্য এক বিশাল ব্যাটারি বলা যায়।
ফ্যাকাশে পাথরের দেওয়ালে ঘেরা নীল জলের মার্বেল লেক ফটোতে বারবার দেখা যায়। সাধারণভাবে ধরা হয়, বাঁধ তৈরির সময় খোঁড়া গর্তে জল জমে এটি তৈরি। প্রকল্পটার সমালোচকও আছেন: স্থানীয় নানা সংগঠন আর নদী-বিষয়ক নেটওয়ার্ক SANDRP জঙ্গল আর জীবিকা হারানোর কথা লিখেছে।
বামনি আর তুর্গা ঝরনা
Bamni & Turga Falls
বামনি ঝরনা পাহাড়ের মাথা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার। লম্বা সিঁড়ি বেয়ে পাথুরে খাদে নামতে হয় — আসল ব্যায়াম ফেরার চড়াইটা। প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে, তুর্গা বাঁধের কাছে তুর্গা ঝরনায় পৌঁছনো সহজ। শীতে দুটোতেই বর্ষার পরের চেয়ে জল কম, কিন্তু টলটলে, আর পাথর শুকনো থাকায় সাবধানে হাঁটা যায়।
- সাবধান
- ভেজা পাথর পিছল; ঝরনার উপর চড়বেন না
চড়িদা, মুখোশের গ্রাম
Charida
বাঘমুণ্ডি ব্লকের এই গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িই ছৌ মুখোশের কারখানা। সূত্রধর সম্প্রদায়ের কারিগরেরা মাটির ছাঁচে কাগজ আর কাপড়ের পরত চাপিয়ে, রং করে মুখ গড়েন, তারপর দেবতা-অসুরের মাথায় বসান বিশাল মুকুট। পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) তকমা পেয়েছে, ২০১৮ সালে নথিভুক্ত।
কাজ দেখতে পারবেন, কারিগরের কাছ থেকে সরাসরি কিনতেও পারবেন — হাতের তালুর মাপের স্মারক থেকে পুরো নাচের মুখোশ পর্যন্ত।
খয়রাবেড়া আর মুরগুমা
Khairabera & Murguma
পাহাড়ে ঘেরা আরও দুটো শান্ত জলাধার। মুরগুমায় পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের থাকার জায়গা আছে — পাহাড়ের মাথার ভিড় এড়িয়ে একটা রাত কাটানোর ভাল জায়গা। খয়রাবেড়া মালভূমি ঘোরার পথেই পড়ে।
উত্তর পুরুলিয়া: ভাঙা গড়, সিনেমার পাহাড়, একটা হ্রদ
গড় পঞ্চকোট
Garh Panchakot
পাঞ্চেত পাহাড়ের পায়ের কাছে পঞ্চকোট রাজাদের গড়ের ধ্বংসাবশেষ, নিতুড়িয়া ব্লকে, পুরুলিয়া শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার। গড়ের শুরু আনুমানিক ১৬০০ সালে। স্থানীয় মতে আঠারো শতকের বর্গি হানায় তা ধ্বংস হয়। আজ পড়ে আছে ভাঙা তোরণ, জঙ্গলের মধ্যে দেওয়াল, আর খিলানে টেরাকোটার কাজ-সহ এক ভাঙা পঞ্চরত্ন মন্দির।
- পরামর্শ
- সন্ধে নামার আগে পাহাড় ছাড়ুন; অন্ধকারে জায়গাটা নির্জন
বড়ন্তী
Baranti
একদিকে নিচু পাহাড়, অন্যদিকে গ্রাম, মাঝখানে মুরাডি জলাধার — পাঞ্চেত পাহাড় থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। ছোট ছোট হোমস্টে, করার প্রায় কিছুই নেই, আর অসাধারণ সূর্যাস্ত। গড় পঞ্চকোটের সঙ্গে জুড়ে নেওয়াই স্বাভাবিক।
জয়চণ্ডী পাহাড়
Joychandi Pahar
রঘুনাথপুর থেকে কিলোমিটার দুয়েক দূরে ন্যাড়া পাথরের কয়েকটা পাহাড়, মাথায় চণ্ডীর মন্দির, ওঠার সিঁড়ি। সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)-র অনেকটা শুটিং এখানেই। রক ক্লাইম্বিংয়ের জনপ্রিয় জায়গা, আর প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে নিজের নামেই রেল স্টেশন।
দেউলঘাটা
Deulghata
কাঁসাই (কংসাবতী) নদীর পাড়ে পুরনো ইটের মন্দির, পুরুলিয়া শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার। সাধারণত নবম-দশম শতকের বলে ধরা হয়। তিনটি উঁচু ইটের দেউলের মধ্যে দুটি আজও দাঁড়িয়ে। মকর সংক্রান্তিতে এই নদীর পাড়ে টুসু ভাসানের মেলা বসে।
তিন দিনের প্ল্যান
প্রথম দিন: কলকাতা থেকে পাহাড়ের মাথা
সকালের ট্রেনে পুরুলিয়া, বা গাড়িতে। শহরে দুপুরের খাওয়া সেরে বিকেলের মধ্যে অযোধ্যা। ময়ূর পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত, রাত পাহাড়ের মাথায়।
দ্বিতীয় দিন: মালভূমি প্রদক্ষিণ
সূর্যোদয়ের পর আপার আর লোয়ার ড্যাম, মার্বেল লেক, বামনি ঝরনা (রোদ চড়ার আগে যান, ফেরার চড়াই খাড়া)। দুপুরের খাওয়ার পর তুর্গা ঝরনা, মুখোশ দেখতে চড়িদা, ফেরার পথে খয়রাবেড়া। রাত পাহাড়ের মাথায় বা মুরগুমায়।
তৃতীয় দিন: উত্তরে, তারপর বাড়ি
উত্তরে গড় পঞ্চকোট আর বড়ন্তী, পথে জয়চণ্ডী পাহাড়। সন্ধের ট্রেন আদ্রা বা আসানসোল থেকে, অথবা দুর্গাপুর হয়ে গাড়িতে ফেরা। চতুর্থ দিন হাতে থাকলে দেউলঘাটা জুড়ুন, আর একটা রাত বড়ন্তীতে।
শীতে কী কী হয়
- টুসু পরব চলে গোটা পৌষ মাস জুড়ে (মধ্য-ডিসেম্বর থেকে মধ্য-জানুয়ারি), শেষ হয় মকর সংক্রান্তিতে, ১৪-১৫ জানুয়ারি নাগাদ, যেদিন টুসু ভাসানো হয়। মাস জুড়ে মেয়েরা টুসুর গান গায়; শেষ দিনে নদীর পাড়ে পাড়ে মেলা, দেউলঘাটাতেও।
- ছৌ মূলত বসন্তের নাচ, মার্চ-এপ্রিলের চৈত্র পরবের সঙ্গে জড়িয়ে। শীতে গ্রামে দেখার চেয়ে মেলা বা উৎসবের মঞ্চে দেখার সম্ভাবনা বেশি, তাই স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করুন।
- ঝুমুর, এই অঞ্চলের লোকগান, প্রায় প্রতিটি মেলায় শোনা যায়।
লোকে যা জিজ্ঞেস করেন
পুরুলিয়া যাওয়ার সবচেয়ে ভাল সময় কখন?
ঠান্ডা, পরিষ্কার আবহাওয়া আর আরামে হাঁটার জন্য ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। পলাশের জন্য মার্চের গোড়া, তবে তখন দুপুরে গরম। এপ্রিল থেকে জুন এড়িয়ে চলুন — তখন পুরুলিয়া রাজ্যের সবচেয়ে গরম জেলাগুলির একটা।
পুরুলিয়ার জন্য কত দিন লাগে?
দু-রাতে অযোধ্যা পাহাড় আর মালভূমি হয়ে যায়। তিন রাত থাকলে তাড়াহুড়ো না করে জেলার উত্তরের গড় পঞ্চকোট, বড়ন্তী আর জয়চণ্ডী পাহাড়ও জোড়া যায়।
পুরুলিয়া থেকে অযোধ্যা পাহাড় কীভাবে যাব?
পুরুলিয়া শহর বা বলরামপুর স্টেশন থেকে ভাড়ার গাড়িতে। বলরামপুর থেকে মাঠা হয়ে পাহাড়ের মাথা প্রায় ৪০ কিলোমিটার, মোটামুটি দেড় ঘণ্টা। পাহাড়ে ওঠার বাস প্রায় নেই।
ডিসেম্বরে পুরুলিয়ায় কি ঠান্ডা থাকে?
সকাল আর রাত ঠান্ডা, বিশেষ করে অযোধ্যার মালভূমিতে। জেলার গড় সর্বনিম্ন ১১-১২ ডিগ্রির আশেপাশে, তবে খোলা জায়গায় ভোরে তার চেয়ে অনেক বেশি ঠান্ডা লাগে। দিনে রোদ, আরামের আবহাওয়া।
শীতে কি ছৌ নাচ দেখা যায়?
কখনও কখনও, মেলা বা উৎসবে। প্রথাগত মরসুম বসন্ত, চৈত্র পরবের সময়। তবে চড়িদায় মুখোশ তৈরি দেখতে যে-কোনও সময় যাওয়া যায়।