কালীপুজোর আগের রাত। যেমন দরকারের সময় হয়, ঠিক তেমনই কারেন্ট চলে গেছে, আর বাড়ির চোদ্দটা অন্ধকার কোণে চোদ্দটা মাটির প্রদীপ কাঁপছে।
পুকুরপাড়ে কে যেন মাছ চাইছে। তেঁতুলগাছে হাওয়া নেই, তবু একটা সাদা শাড়ি দুলছে। আর অন্ধকার গলি থেকে কেউ আপনার নাম ধরে ডাকছে — ঠিক মায়ের গলায়।
সাড়া দেবেন না। এখনই না।
প্রত্যেক বাঙালি ছেলেমেয়ে বড় হয় মাথার মধ্যে একটা ভূতের মানচিত্র নিয়ে: বাড়ির পিছনের বাঁশবাগান, পুকুরধারের পুরনো তেঁতুলগাছ, মাঠের শেষে বটগাছ, ভাঙা জমিদারবাড়ি। বাংলার ভূতেরা কিন্তু এক দঙ্গল নয়। প্রত্যেকের নিজের ইতিহাস, নিজের ঠিকানা, তাড়ানোর নিজের উপায় — আর কোনটা কে, সে ব্যাপারে ঠাকুমা-দিদিমারা ছিলেন ভারী নিখুঁত।
এটি তাদেরই পরিচয়-পুস্তিকা, লোকবিশ্বাসে যেমনটি বলা হয়। ভূত আছে, এমন দাবি এখানে নেই — আছে বাংলা কী বিশ্বাস করত, আর ভূত চতুর্দশীর রাতে আজও আধাআধি করে, তার খতিয়ান।
আগে জেনে নিন, ভূতে কথা বলে কীভাবে
বাংলা গল্পে ভূত চেনা যায় গলা শুনেই। বাংলার ভূতেরা কথা বলে নাকি সুরে, আর লেখকেরা সেটা বোঝান প্রায় প্রতিটি অক্ষরের মাথায় চন্দ্রবিন্দু বসিয়ে। ভূত কখনও বলে না, ‘আমি তোমার ঘাড় মটকাব’। বলে:
আঁমি তোঁমার ঘাঁড় মঁটকাঁব!
নাকি সুরের ব্যাপারটা কবে, কোথা থেকে এল, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। যতদিন ধরে বাংলায় ভূতের গল্প লেখা হচ্ছে, ভূতের গলা ততদিন এমনই — আর আজও প্রত্যেক গল্পবলিয়ে গলাটা নকল করেন।
এক এক করে ভূতেরা
পেত্নী
Petni
বাংলার সবচেয়ে চেনা ভূত। ঠাকুমা যখন বলতেন ‘সন্ধের পর ওই গাছের কাছে যাস না’, বেশিরভাগ সময় তাঁর মাথায় থাকত পেত্নী। পেত্নী সেই নারীর অতৃপ্ত আত্মা, যার সাধ মেটেনি — অনেক গল্পে, যে অবিবাহিত অবস্থায় মারা গেছে।
তার বাস গাছে, যত বড় আর অন্ধকার তত ভালো: তেঁতুল, শ্যাওড়া, বট। পরনে সাদা শাড়ি, খোলা লম্বা চুল, আর অনেক গল্পে তার পা উল্টো দিকে ঘোরানো — সাহস করে নীচে তাকালে ওভাবেই চেনা যায়। মাছ তার প্রিয়, আর রাতে গাছের নীচ দিয়ে যে যায় তাকে ভয় দেখানো তার শখ।
- আস্তানা
- তেঁতুল, শ্যাওড়া ও বটগাছ
- চেনার উপায়
- সাদা শাড়ি, খোলা চুল, উল্টো পা
- লোকমতে রক্ষা
- লোহা, আগুন আর রাম নাম
শাঁকচুন্নি
Shakchunni
নামটা এসেছে ‘শঙ্খচূর্ণী’ থেকে — যে শাঁখা পরে। শাঁকচুন্নি বিবাহিত নারীর ভূত, সংসারের মায়া যে কাটাতে পারেনি।
সে থাকে পুকুরপাড়ে, ঘাটের ধারের গাছে। তার একটাই সাধ — কোনো জীবন্ত বিবাহিত মেয়ের উপর ভর করে আবার ঘর-সংসার করা। সন্ধেবেলা খোলা চুলে গাছতলা বা পুকুরঘাটে না যাওয়ার পুরনো সাবধানবাণী অনেকে তার কথা ভেবেই দেন।
- আস্তানা
- পুকুর ও ঘাটের ধারের গাছ
- চেনার উপায়
- সাদা শাড়ি, হাতে শাঁখা
- চায়
- বিবাহিত মেয়ের জীবন
ব্রহ্মদৈত্য
Brahmadaitya
ব্রাহ্মণের ভূত — বাংলার ভূতজগতের অভিজাত। তার বাস বেলগাছে বা অশ্বত্থগাছে, মরার পরও গলায় পৈতে, আর বর্ণনায় সে সাধারণত লম্বা, ফর্সা, গম্ভীর।
অন্য ভূতেদের মতো নয়, ব্রহ্মদৈত্য প্রায়ই দয়ালু। অনেক গল্পে সে গরিব সৎ মানুষকে সাহায্য করে, ছোটখাটো ভূতেদের শাসনে রাখে, কিংবা শুধু চায় তাকে তার পুঁথি নিয়ে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হোক। তবে রাগালে সে যেকোনো পেত্নীর চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী।
- আস্তানা
- বেল ও অশ্বত্থগাছ
- চেনার উপায়
- সাদা ধুতি, গলায় পৈতে
- মেজাজ
- সাধারণত শান্ত। অপমান করবেন না।
মেছো ভূত
Mechho Bhoot
মেছো মানে মাছের — আর এই ভূত চায় শুধু একটাই জিনিস। সে ঘোরে পুকুরপাড়ে, মাছের বাজারে, গ্রামের রান্নাঘরের আশেপাশে। সন্ধের পর যে ব্যাগে মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরে, নাকি সুরে ডাকতে ডাকতে তার পিছু নেয়: ‘মাঁছ দেঁ!’
ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করলে বলবেন, এই জন্যেই রাতে মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতে নেই। মাছটা দিয়ে দিলে সে আর জ্বালায় না। না দিলে, গল্প বলে, রান্নাঘর পর্যন্ত পিছু নেবে আর কাঁচা মাছই খেয়ে যাবে।
- আস্তানা
- পুকুর, মাছের বাজার, রান্নাঘর
- চায়
- মাছ
- সমাধান
- মাছটা দিয়ে দিন
স্কন্ধকাটা
Skondhokata
মাথাকাটা ভূত — যার মৃত্যুর সময় মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। বিশ শতকের গল্পে সে প্রায়ই রেলে কাটা পড়া মানুষ, তাই বলা হয় রাতে সে রেললাইন ধরে হাঁটে।
মাথা নেই, তাই চোখও নেই। অন্ধকারে দু-হাত বাড়িয়ে সে হাতড়ে হাতড়ে নিজের মাথা খোঁজে, আর হাতের নাগালে যা পায় তাই আঁকড়ে ধরে।
- আস্তানা
- রেললাইন, নির্জন রাস্তা
- চেনার উপায়
- মাথা নেই, দু-হাত সামনে বাড়ানো
নিশি
Nishi
সবচেয়ে ভয়ের, কারণ তাকে কখনও দেখা যায় না। নিশুতি রাতে নিশি আসে আর আপনার নাম ধরে ডাকে — কোনো প্রিয়জনের গলায়: মা, বন্ধু, স্বামী। সাড়া দিয়ে পিছু নিলে, গল্প বলে, মানুষ ঘর ছেড়ে অন্ধকারে বেরিয়ে যায় আর ফেরে না — কিংবা সকালে তাকে পাওয়া যায় পুকুরধারে, রাতের কিছুই মনে নেই।
নিয়ম একটাই, আর প্রত্যেক বাঙালি ছেলেমেয়ে তা জানে: নিশি দু’বারের বেশি ডাকে না। তাই রাতে কেউ নাম ধরে ডাকলে অপেক্ষা করুন। সত্যিকারের মানুষ হলে তৃতীয়বারও ডাকবে।
কোনো কোনো গল্পে নিশি স্বাধীন আত্মাই নয় — কোনো তান্ত্রিক তাকে পাঠায় কারও প্রাণ নিতে। আর ‘নিশির ডাক’ কথাটা এখন বলা হয় এমন যেকোনো টানের জন্য, যা উপেক্ষা করা যায় না।
- আসে
- মাঝরাতের পরে
- গলা
- কোনো প্রিয়জনের, নাম ধরে ডাকে
- নিয়ম
- তৃতীয় ডাকের আগে সাড়া নয়
আলেয়া
Aleya
নিম্নবঙ্গের জলা-বিল রাতে পার হতে গিয়ে জেলে আর পথিকেরা দেখতেন, জলের উপর আলো ভাসছে, নাচছে, কাছে গেলেই সরে যাচ্ছে। পিছু নিলে সে টেনে নিয়ে যায় আরও গভীর জলায়, যেখানে মানুষ ডুবে মরে। বলা হত, এ আলো ভূতের — প্রায়ই জলে ডোবা মানুষের, যারা সঙ্গী খোঁজে।
এই একটি ভূতের পিছনে বিজ্ঞানেরও একটা সন্দেহ আছে। জলার উপর এমন আলোর কথা সারা পৃথিবী থেকে শোনা যায়, ইংরেজিতে যার নাম উইল-ও’-দ্য-উইস্প। সাধারণ ব্যাখ্যা হল জলাভূমির গ্যাস: পচা গাছপালা থেকে ওঠা মিথেন, বাতাসে সামান্য ফসফিন জ্বলে উঠে যাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে গবেষণাগারে কেউ নির্ভরযোগ্যভাবে এমন আলো তৈরি করে দেখাতে পারেননি, তাই রহস্যের পুরো সমাধান হয়নি।
আলেয়া বাংলাকে একটা প্রবাদও দিয়েছে: আলেয়ার পিছনে ছোটা — যা নেই, তার পিছনে ছোটা।
- আস্তানা
- জলা, বিল, নিচু জমি
- চেনার উপায়
- জলের উপর ভাসমান ছোট আলো
- বিজ্ঞান বলে
- সম্ভবত জ্বলন্ত জলাভূমির গ্যাস
কানাভুলো
Kanabhulo
সারাজীবনের চেনা মাঠ পার হতে বেরিয়েছেন। হাঁটছেন তো হাঁটছেনই। ভোরের আলো ফুটলে দেখেন, যেখান থেকে শুরু করেছিলেন ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে — সারারাত অন্ধকারে গোল হয়ে ঘুরেছেন। এ কানাভুলোর কাজ, যে ভূত পথিকের পথ ভুলিয়ে দেয়।
আর কোনো ক্ষতি সে করে না, শুধু মাথা থেকে দিকজ্ঞানটা কেড়ে নেয়। অমাবস্যার রাতে আলো ছাড়া মাঠ পেরোনোর চেষ্টা যে করেছে, সে বুঝবে এমন বিশ্বাসের জন্ম কীভাবে।
- আস্তানা
- খোলা মাঠ ও ধানখেত
- কী করে
- ভোর পর্যন্ত গোল গোল ঘোরায়
বেঘো ভূত
Begho Bhoot
সুন্দরবনে, যেখানে আজও বাঘের হাতে মানুষ মরে, বলা হয় বাঘে-মারা মানুষ বেঘো ভূত হয়। এক বিশ্বাস অনুযায়ী সেই আত্মা বাঘের সঙ্গে বাঁধা পড়ে, আর বাঘকে তার পরের শিকারের কাছে নিয়ে যায় — কখনও মানুষের গলায় ডেকে কাঠুরে আর মউলেদের টেনে নেয় জঙ্গলের আরও গভীরে।
বাঘ আর ভূত, দুইয়ের হাত থেকেই বনের মানুষদের রক্ষাকর্ত্রী বনবিবি — বনের দেবী, সুন্দরবনের হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষই জঙ্গলে ঢোকার আগে যাঁকে স্মরণ করেন।
- আস্তানা
- সুন্দরবন
- রক্ষাকর্ত্রী
- বনবিবি, বনের দেবী
যক্ষ
Jokkho
যক্ষ মাটির নীচে পোঁতা ধনসম্পদ পাহারা দেয়। এই তালিকার সবচেয়ে অন্ধকার কিংবদন্তি বলে, সেকালের কৃপণেরা চাইতেন তাঁদের ধন চিরকাল পাহারায় থাকুক — তাই একটি বালককে জ্যান্ত সেই ধনের সঙ্গে গুপ্তঘরে বন্ধ করে দিতেন, যাতে তার আত্মা হয় সেই ধনের যক্ষ, আর কাউকে ছুঁতে না দেয়। রবীন্দ্রনাথের গল্প ‘সম্পত্তি-সমর্পণ’ এই বিশ্বাস নিয়েই লেখা।
কিংবদন্তিটি বেঁচে আছে রোজকার কথায়: যক্ষের ধন — যে জিনিস কেউ আগলে রাখে, নিজেও ব্যবহার করে না, কাউকে করতেও দেয় না।
- পাহারা দেয়
- পোঁতা ধনসম্পদ
- বেঁচে আছে
- ‘যক্ষের ধন’ কথায়
ভূত তাড়ানোর বাঙালি টোটকা
ঠাকুমাদের কাছে সবকিছুরই টোটকা ছিল, আর তার বেশিরভাগ আজও একটু মুচকি হেসে বলা হয়:
- লোহা। পকেটে চাবি, ছুরি বা যেকোনো লোহার টুকরো থাকলে ভূত কাছে আসে না — এমনই বিশ্বাস। তাই আঁতুড়ঘরে মা আর নবজাতকের কাছে লোহা রাখা হত।
- আলো। ভূত আলো সইতে পারে না — ভূত চতুর্দশীর চোদ্দ প্রদীপের পিছনেও এই বিশ্বাসের খানিকটা আছে।
- রাতে প্রথম ডাকে সাড়া নয়। উপরে নিশির কথা দেখুন।
- সন্ধের পর মাছ নিয়ে নয়। মেছো ভূতের কথা মনে রাখুন।
- রাম নাম। রামের নাম নিলে কোনো ভূত ছুঁতে পারে না। অন্ধকার গাছের পাশ দিয়ে যেতে যেতে ছোটরা ফিসফিস করে বলত এই ছড়া:
ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি,রাম-লক্ষ্মণ বুকে আছে, করবি আমার কী?
ভূত চতুর্দশী: যে রাতে ভূতেদের ডেকে আনা হয়
বছরে একবার বাংলা একটা অদ্ভুত কাজ করে: পথে আলো জ্বালে। কালীপুজোর আগের রাতে, ভূত চতুর্দশীতে, বাড়ির চোদ্দ কোণে চোদ্দটা প্রদীপ জ্বলে, আর দুপুরে পাতে পড়ে চোদ্দ শাক। প্রদীপ জ্বলে চোদ্দ পুরুষের জন্য, যাঁরা সে রাতে বাড়ি ফেরেন বলে বিশ্বাস — আর অবাঞ্ছিত অশরীরীদের বাইরে রাখতে। পড়ুন চোদ্দ প্রদীপ আর চোদ্দ শাকের নিয়ম, আর এ বছরের তারিখ দেখুন কালীপুজোর পাতায়।
একে প্রায়ই বলা হয় বাংলার হ্যালোইন, আর দুটো পড়েও কাছাকাছি সময়ে। কিন্তু মেজাজ আলাদা: হ্যালোইন সাজগোজ আর ভয় দেখানোর উৎসব; ভূত চতুর্দশী পরিবারের নিজের পূর্বপুরুষদের ঘরে ফেরার পথ আলো করার রাত।
বই আর সিনেমায় ভূতেরা
একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঙালি লেখকেরা তাঁদের ভূতেদের ভালোবেসেছেন — আর সেরা গল্পগুলির অনেকগুলিই ভয়ের নয়, হাসির:
- ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৪৭–১৯১৯) লিখেছেন মজার ভূতের গল্প, যেখানে ভূতেরাও মানুষের মতোই বোকামি করে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন বাংলা ভাষার কয়েকটি সেরা ভৌতিক গল্প: ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘মণিহারা’, ‘কঙ্কাল’।
- উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, যেখানে ভূতের রাজা দুই হতভাগা গাইয়ে-বাজিয়েকে তিনটি বর দেন। তাঁর নাতি সত্যজিৎ রায় ১৯৬৯ সালে এ নিয়ে ছবি করেন।
- শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ছোটদের উপন্যাস, যেমন ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’, যেখানে এক ভূতই নায়কের প্রাণের বন্ধু।
- লীলা মজুমদারের ছোটদের ভূতের গল্প।