কৃষ্ণনগরের রাজসভা, আঠারো শতকের কোনো এক সকাল। মহারাজ ঘুম থেকে উঠেছেন বেজায় মেজাজ খারাপ করে। পণ্ডিতেরা মেঝের দিকে তাকিয়ে, মন্ত্রীরা তাকিয়ে পণ্ডিতদের দিকে।
আর ঘরের প্রত্যেকের চোখ আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে পিছনের সারির একজনের দিকে, যিনি ইতিমধ্যেই মুচকি হাসছেন।
তিনি গোপাল ভাঁড় — নদিয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভার ভাঁড়, আর এত বাংলা গল্পের নায়ক যে কেউ কখনও গুনে শেষ করতে পারেনি। সেসব গল্পে রাজা অহংকারী, সভাসদেরা হিংসুটে, ব্যবসায়ীরা লোভী — আর গোপাল শুধু বুদ্ধির জোরে সবাইকে সিধে করে দেন, গোটা সভাকে হাসাতে হাসাতে।
এখানে তার সেরা পাঁচটি, আমাদের নিজের ভাষায়। তারপর সেই প্রশ্ন, যা প্রত্যেক বাঙালি কখনও না কখনও করে: গোপাল কি সত্যিই ছিলেন?
১. গোপালের স্বর্গযাত্রা
রাজার নাপিত কোনোদিনই গোপালকে পছন্দ করত না। গোপাল সভা মাতিয়ে রাখেন, রাজা তাঁর কথা শোনেন; আর নাপিত রোজ সকালে রাজার দাড়ি কামায়, রাজা তাকে খেয়ালই করেন না। তাই এক সকালে, ক্ষুর হাতে, নাপিত একটা প্রস্তাব দিল।
‘মহারাজ, আপনি প্রায়ই ভাবেন, স্বর্গে আপনার স্বর্গীয় পিতা কেমন আছেন। নদিয়ার সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ গোপালকেই পাঠানো যাক না খোঁজ নিতে? পূর্ণ মর্যাদায়, চিতায় চড়িয়ে।’
রাজার প্রস্তাবটা যতটা পছন্দ হওয়া উচিত, তার চেয়ে বেশিই হল। তিনি গোপালকে ডাকলেন। গোপাল মাথা নুইয়ে বললেন, ‘এ তো পরম সৌভাগ্য, মহারাজ। শুধু আমাকে এক মাস সময় দিন তৈরি হতে, আর চিতাটা সাজানো হোক আমার বাড়ির পাশের জমিতে।’
এক মাস ধরে, রাতের অন্ধকারে, গোপাল আর তাঁর ছেলেরা জমির মাঝখান থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ খুঁড়লেন। নির্দিষ্ট দিনে চিতা সাজানো হল ঠিক সুড়ঙ্গের মুখের উপর। গোপাল শুয়ে পড়লেন, আর ধোঁয়া একটু ঘন হতেই টুক করে নেমে গেলেন মাটির নীচে, হেঁটে পৌঁছলেন বাড়ি। তারপর ছ’মাস ঘর থেকে বেরোলেন না, চুল-দাড়ি বাড়তে দিলেন ইচ্ছেমতো।
এক সকালে তিনি সভায় ঢুকলেন, সন্ন্যাসীর মতো জটাজুট নিয়ে। ‘মহারাজ, আপনার পিতার সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি ভালো আছেন, আশীর্বাদ পাঠিয়েছেন। শুধু একটাই অভিযোগ: স্বর্গে একটাও নাপিত নেই। ছ’মাসে আমার দশা দেখুন! তিনি অনুরোধ করেছেন, আপনার নাপিতকে যেন এখনই পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’
সভার সব চোখ ঘুরল নাপিতের দিকে। সে রাজার পায়ে আছড়ে পড়ে সব ষড়যন্ত্র কবুল করল। রাজা হাসতে হাসতে চোখে জল এনে ফেললেন।
২. গন্ধের দাম
কৃষ্ণনগরের এক ময়রা দুটো জিনিসের জন্য বিখ্যাত ছিল: শহরের সেরা সন্দেশ আর শহরের সবচেয়ে কিপটে মন। এক দুপুরে এক গরিব মানুষ তার দোকানের বাইরে বসে পান্তাভাত খাচ্ছিল, আর রস ফোটার গন্ধে বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছিল।
‘আমার মিষ্টির মজা নিচ্ছ,’ বলল ময়রা, ‘পয়সা দাও।’ ‘একটা দানাও তো খাইনি!’ ‘গন্ধ খেয়েছ। গন্ধেরও দাম আছে।’ ঝগড়া এমন চড়ল যে মামলা গিয়ে পৌঁছল রাজসভায়, আর রাজা মজা পেয়ে বিচারের ভার দিলেন গোপালকে।
গোপাল গম্ভীর মুখে শুনলেন। ‘ময়রা ঠিকই বলেছে,’ বললেন তিনি, ‘গন্ধেরও দাম আছে।’ গরিব মানুষটার মুখ সাদা হয়ে গেল। গোপাল তার কাপড়ের খুঁট থেকে কটা পয়সা খুলে নিয়ে ময়রার কানের কাছে ধরে ঝাঁকালেন। ঝনঝন। ঝনঝন। ঝনঝন।
‘ব্যস। ও তোমার মিষ্টির গন্ধ নিয়েছে, তুমি ওর পয়সার আওয়াজ নিলে। শোধবোধ।’ বলে পয়সাগুলো ফিরিয়ে দিলেন তার মালিককে।
৩. বখরা
রাজবাড়ির নতুন দারোয়ানের নিজস্ব একটা নিয়ম ছিল: রাজার কাছে যে যাবে, বেরিয়ে এসে যা পাবে তার বখরা দিতে হবে। গোপাল এসেছিলেন এমন এক গল্প নিয়ে যা রাজার ভারী পছন্দ হবে। ‘অর্ধেক,’ বলল দারোয়ান, ‘যা পাবে তার অর্ধেক আমার।’ গোপাল সঙ্গে সঙ্গে রাজি।
গল্প জমে গেল। চোখ মুছতে মুছতে রাজা বললেন, ‘যা চাও তাই দেব, গোপাল।’ ‘তবে মহারাজ, আমাকে একশো বেত মারার হুকুম দিন।’
সভা স্তব্ধ। হতভম্ব রাজা বেত হাতে নিতেই গোপাল হাত তুললেন। ‘দাঁড়ান মহারাজ। কথা দিয়েছি, যা পাব তার অর্ধেক আপনার দারোয়ানের। আগে ও ওর পঞ্চাশটা নিয়ে নিক।’
দারোয়ান পেল তার পঞ্চাশ বেত, আর হারাল চাকরি। গোপাল পরদিন সকালে পেলেন আসল পুরস্কার।
৪. গরুর ছবি
রাজা ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা ঘোষণা করলেন — প্রত্যেক সভাসদকে একটা করে ছবি আনতে হবে। গোপাল একটা সোজা দাগও টানতে পারতেন না। ক্যানভাস বাড়ি নিয়ে গেলেন, আর এক সপ্তাহ পরে ফেরত আনলেন একদম ফাঁকা।
‘এটা কী?’ জিজ্ঞেস করলেন রাজা। ‘গরু ঘাস খাচ্ছে, মহারাজ।’ ‘ঘাস কোথায়?’ ‘গরু খেয়ে ফেলেছে।’ ‘তাহলে গরু কোথায়?’ ‘মহারাজ, ঘাসই যখন শেষ, গরু আর দাঁড়িয়ে থাকবে কেন?’
৫. অপয়া মুখ
কৃষ্ণনগরে এক লোক ছিল, সবাই তাকে বলত অপয়া। সকালে উঠে প্রথম তার মুখ দেখলে নাকি সারাদিন খারাপ যায়। রাজা এসব কথা হেসে উড়িয়ে দিতেন, আর তা প্রমাণ করতে এক সকালে লোকটাকে নিজের শয্যার পাশে আনালেন, যাতে প্রথম মুখটা তারই দেখেন।
সেদিন সব উল্টোপাল্টা হল। দূত খারাপ খবর আনল, রাজার প্রিয় ঘোড়া খোঁড়া হল, আর কাজের চাপে রাজার সারাদিন খাওয়াই হল না। সন্ধেবেলা রাজা রেগে আগুন। ‘লোকটা সত্যিই অপয়া। কাল সকালেই ওকে ফাঁসি দাও।’
লোকটার বাড়ির লোক ছুটল গোপালের কাছে। পরদিন সকালে ফাঁসির মঞ্চের নীচে দাঁড়িয়ে লোকটা রাজার সঙ্গে শেষ একটা কথা বলার অনুমতি চাইল, আর বলল গোপালের শিখিয়ে দেওয়া কথাটা:
‘মহারাজ, কথাটা সত্যি। কাল আপনি প্রথম আমার মুখ দেখেছিলেন, আপনার এক বেলা খাওয়া হয়নি। কিন্তু কাল আমিও প্রথম আপনার মুখ দেখেছিলাম, আর আজ আমার ফাঁসি। এবার বলুন, অপয়া মুখটা কার?’
রাজা বুঝলেন। লোকটাকে ছেড়ে দিলেন, আর পয়া-অপয়া মুখের কথা আর কখনও মুখে আনেননি।
গোপাল ভাঁড় কি সত্যিই ছিলেন?
কেউ নিশ্চিত জানে না, আর এ নিয়ে বাঙালির তর্ক চলছে একশো বছর ধরে। তাঁর রাজা অবশ্যই সত্যি: কৃষ্ণচন্দ্র রায় ১৭২৮ সাল থেকে আমৃত্যু, অর্থাৎ ১৭৮০-র দশকের গোড়া পর্যন্ত, নদিয়া শাসন করেছেন। গোপালকে ধরা অনেক কঠিন।
- বিপক্ষে: উনিশ শতকের আগে বাংলা লেখায় গোপালের নাম পাওয়া যায় না। কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন দুই বড় কবি, ভারতচন্দ্র রায় আর রামপ্রসাদ সেন — দুজনের কেউই গোপাল নামে কোনো ভাঁড়ের কথা লেখেননি।
- পক্ষে: ১৯২৬ সালে নগেন্দ্রনাথ দাস, যিনি নিজেকে গোপালের বংশধর বলতেন, ‘নবদ্বীপ-কাহিনী’ বইয়ে গোপালের জন্মনাম দেন গোপালচন্দ্র নাই, আর বলেন তিনি নাপিত পরিবারের সন্তান। (তাহলে স্বর্গযাত্রার গল্পটা আরও মজার!)
- অমীমাংসিত: সাহিত্য-ইতিহাসবিদ সুকুমার সেন প্রশ্নটা খোলা রেখেছেন, আর কেউ কেউ বলেন রাজসভার নথিপত্র স্রেফ হারিয়ে গেছে।
আমাদের মত: কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় সত্যিই হয়তো এক রসিক মানুষ ছিলেন, আর গল্প যেমন জমে, তেমনই তাঁর নামের চারপাশে জমেছে। যা-ই হোক, বাংলার যতটা দরকার, গোপাল ঠিক ততটাই সত্যি।
কৃষ্ণনগরে গেলে
- রাজবাড়ি — নদিয়া রাজপরিবারের প্রাসাদ, যার সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসব জগদ্ধাত্রী পুজো।
- ঘূর্ণি — মাটির পুতুলের জন্য বিখ্যাত কৃষ্ণনগরের পাড়া, যেখানে আর সবকিছুর সঙ্গে মাটির গোপালও পাবেন।
- সরপুরিয়া আর সরভাজা — কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত মিষ্টি। শুধু গন্ধ নিতে এসেছেন, এমন কথা ময়রাকে বলবেন না।